প্রারম্ভিকা
বিষাদ সিন্ধু নামটির ভাবার্থ করলে আমরা পাই,যে বিষাদ সিন্ধু নদীর মতো বড়ো ক্ষত তৈরি করে রেখেছে। মীর মশাররফ হোসেনের লেখা বিষাদ সিন্ধু বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় বা বহুলপঠিত উপন্যাসের মধ্যে যে কয়েকটি বইয়ের নাম আসবে সবার প্রথমে সেখানে এই বইটি অনায়াসে জায়গা দখল করে নিবে। উপন্যাসটি খন্ড খন্ড আকারে কয়েক বছর গ্যাপে গ্যাপে প্রকাশিত হয়েছিলো। মোট তিনটি পর্বে প্রকাশিত উপন্যাসটির প্রথম খণ্ড (মহররম পর্ব) প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে,বইটির দ্বিতীয় খণ্ড (এজিদ বধ পর্ব) প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে এবং তৃতীয় খণ্ড (উদ্ধার পর্ব) প্রকাশিত হয় ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ(স) এর দুই নাতির কিভাবে মৃ*ত্যু হবে তা জিব্রাইল (আঃ) মারফতে তিনি অনেক আগেই জানতে পেরেছিলেন।
বিষাদ সিন্ধুর (প্রথম খণ্ড) প্রকাশের পরপরই কাঙাল হরিনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’তে বলা হয়, ‘ মুসলমানদিগের গ্রন্থ এরূপ বিশুদ্ধ বঙ্গভাষার অল্পই অনূবাদিত ও প্রকাশিত হইয়াছে। এই সকল গ্রন্থ যে বঙ্গভাষার বিস্তৃতির আর একটি নতুন পথ এবং মাতৃভাষা বাংলার প্রতি মুসলমানদিগের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতেছে, ইহা চিন্তাশীল পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন। ‘
বইটি পাঠক হৃদয়ে আন্দোলিত করে দিতে পেরেছিলো সেই স্রোতের ধারা যা ওই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য ইসলামিক ঘটনাবহুল সবচেয়ে পঠিত উপন্যাসের স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
চরিত্র পরিচিতি
(১) ইমাম হাসান (রাঃ)
(২) ইমাম হোসেন (রাঃ)
(৩) এজিদ
(৪) সীমার
(৫) জয়নব
(৬) জায়েদা
(৭) মায়মুনা
অপ্রধান চরিত্রে রয়েছে আরও অনেকেই।
কাহিনী সংক্ষেপ
হযরত মুহাম্মদ (স) একদিন সাহাবীদের সাথে বসে ধর্ম নিয়ে আলোচনা করছিলেন। হঠাৎই তার মন বিষন্নতায় ভরে ওঠে তখন তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,তোমাদের মধ্যে এমন একজন আছো যার ভবিষ্যতে হওয়া সন্তান আমার দুই নাতিকে হ*ত্যা করবে। কে সেই জন? এটা জানতে চাইলে নবীজি বলেন,’তার সাহাবি মাবিয়ার পূত্রের হাতে তার আদরের দুই নাতি হাসান ও হোসেন মৃ*ত্যুবরণ করবেন ‘। মাবিয়া এটা শুনে জীবনে কখনও বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভাগ্যের লীলাখেলার চক্রে তার এমনই একটি রোগ হয় যা থেকে মুক্তির জন্য স্ত্রী সহবাস ছাড়া আর কোন উপায় ছিলোনা। মাবিয়া বাচ্চা না নেয়ার জন্য একজন বয়স্কা নারীকে বিয়ে করেন। কিন্তু যা সৃষ্টিকর্তা লিখে রেখেছেন তা কি কখনো খন্ডানো মানুষের পক্ষে সম্ভব?
সেই বৃদ্ধা মহিলার থেকেই মাবিয়ার একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয় যার নাম রাখা হয় এজিদ। মাবিয়া সন্তানের ফুটফুটে চেহারা দেখে তাকে আর হ*ত্যা করতে পারেনা।
এই ভবিষ্যতবাণীর ভয়ে মাবিয়া তার পরিবার নিয়ে দামেস্কে চলে যান।
এভাবেই সময়ের পরিক্রমায় এজিদ বড়ো হয়ে ওঠে দামেস্কের রাজপুত্ররুপে। এদিকে আব্দুল জব্বারের সুন্দরী স্ত্রীর প্রেমে পড়ে যান এজিদ। আব্দুল জব্বার টাকা ও ধনসম্পদের লোভে পড়ে জনয়বকে তালাক দেয়। মুসলিম নামের এক সংবাদবাহক বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে জয়নবের বাসা যাওয়ার পথে পথিমধ্যে একজন ব্যবসায়ী ও ইমাম হাসানের সাথে দেখা হয় এবং তারাও জয়নবকে বিয়ের আশা মুসলিমের কাছে ব্যক্ত করেন।
মুসলিমের দেওয়া প্রস্তাব থেকে তিনজনের মধ্যে থেকে জয়নব নবীজির নাতি হাসানকে বিয়ে করেন। এজিদ জয়নবকে বিয়ে করতে না পেরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। সে জনয়বকে বিধবা করার জন্য ছটফট করতে থাকেন। মায়মুনাকে অনেক ধন সম্পদের লোভ দেখিয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। মায়মুনা হাসানের দ্বিতীয় স্ত্রী জায়েদাকে প্লানটা খুলে বলে। জায়েদা,তার স্বামীর তৃতীয় স্ত্রীকে একদমই সহ্য করতো না। এজন্য সে রাজি হয়ে হাসানকে দুইবার বি*ষ প্রদান করে কিন্তু হাসান বিষে জর্জরিত হয়েও শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরে আসেন। তৃতীয়বার হীরকচূর্ণ বিষপ্রয়োগে জায়েদা সফল হন এবং হাসানের মৃ*ত্যু হয়।
হোসেনকে হ*ত্যার জন্য কুফায় ডেকে পাঠান এজিদ তারই সাজানো লোকের মাধ্যমে। এভাবেই হোসেন তার দলবলসহ কারবালার প্রান্তরে এসে উপস্থিত হন। সেখানে অতর্কিত আক্রমণে অনেক যো*দ্ধা নিহত হয়। পানির সংকটে সবাই দিশেহারা হয়ে ওঠে।
ইমাম হোসেন তার দাপটে একের পর এক সৈন্য মরে যেতে লাগলো। ইমাম হোসেন ফোরাতের পানি খেতে গিয়ে শিরস্ত্রাণ খুলে ফেলেন। সেই সুযোগে সীমার এসে বি*ষাক্ত তীর ছুড়ে মারে। সীমার হোসেনের গলার ধারালো ছু*রি চালায় কিন্তু গলা কাটে না। হোসেন বুঝে যায় তার নানার ভবিষ্যত বাণী এবার সফল হতে যাচ্ছে। সীমার তার গলার পিছনে চুরি দিয়ে আঘাত করে কারবালার প্রান্তর র*ক্তে ভাসিয়ে দেয়।
ইমাম হাসান ও হোসেনের পরিবারকে অত্যাচারী এজিদ বন্দি করে রাখেন। হযরত মুহাম্মদ (স) আরও একটি ভবিষ্যৎবাণী করেন ইমান হাসান ও ইমাম হোসেনের পরিবারকে সেই কারাগার থেকে তাদেরই বৈমাত্র ভাই মোহাম্মদ হানিফা উদ্ধার করবেন। এজিদের মতো শাসকের কাছ থেকে তাদের উদ্ধার করার পথ মোটেই সহজ ছিলো না। এখানেও অনেক ছোটো ছোটো পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের মুক্তির পথ রচনা হয়। রক্তক্ষয়ী যু*দ্ধের শেষ পরিণতি হিসেবে মোহাম্মদ হানিফা তার পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এজিদের একনায়কতন্ত্র ঔদ্ধতার চূড়ান্ত পাপের পরিণতি হিসেবে তার পরাজয়ের মাধ্যমেই এজিদ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
কিভাবে ঘটে গেলো এতকিছু?
এজিদের স্বৈরাচারী আমল কিভাবে ধূলিসাৎ হলো সেই উত্তেজনার পারদ পুরোটা অনুভব করার জন্য এক নিঃশ্বাসে ধৈর্য্য ধরে পড়ে ফেলতে হবে ঐতিহাসিক ইসলামিক ঘটনাবহুল এই বইটি।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
(ক)পজেটিভ দিক :
প্রথম পয়েন্ট :
মীর মশাররফ হোসেন যে সময়ে বইটি লিখেছিলেন সে সময়ে সাধু ভাষাতেই সাহিত্যচর্চা হতো। লেখকের সাহিত্যিক ভাষার উপস্থাপন,বর্ণনা দেখে রীতিমত অভিভূত হয়ে গেছি। অনেক সুন্দরভাবে সাহিত্যিক ভাষার প্রয়োগ
পুরো বই জুড়ে লেখক দেখিয়েছেন।
দ্বিতীয় পয়েন্ট :
ইমাম হাসান (রাঃ) ও ইমাম হোসেন (রাঃ) এর চরিত্রের মহানুভবতা,ন্যায়পরায়ণতা এবং দয়ার মূর্ছনা অনেক সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসটিতে। পাঠক তাদের চরিত্রে এই বিষয়গুলো খুবই সুন্দরভাবে অনুধাবন করে উপন্যাসটি শেষ করতে পারবে।
তৃতীয় পয়েন্ট :
উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে বিল্ড আপের জন্য অনেক স্পেস দেয়া হয়েছে। এজন্য পাঠকের মাঝে ওই চরিত্রগুলোর জন্য একটা মায়া বা টান কাজ করে। আমার বাবার মুখে শুনেছি,সে এই উপন্যাস পড়ে কেঁদে ফেলতো। ঠিক তেমনি সহস্রাধিক পাঠক ইমোশনালি এ্যাটাচমেন্ট হতে পেরেছিলো এই উপন্যাসটির সাথে যা তাদের কাঁদাতে বাধ্য করেছে ।
চতুর্থ পয়েন্ট :
আরবীয় সভ্যতা ও ইতিহাসকে বাঙালি স্বদেশীয় সংস্কৃতির আলোকে সাজিয়ে উপস্থাপন করার কৃতিত্ব অবশ্যই লেখকের একান্ত নিজের। যার
ফলশ্রুতিতে ইসলামিক ঘটনাবহুল এই বইটি ঐতিহাসিক উপন্যাসের মর্যাদা পেয়েছে।
পঞ্চম পয়েন্ট :
বঙ্কিম ও রবীন্দ্র যুগে এসে মীর মশাররফ হোসেন তার এই উপন্যাসের মাধ্যমে নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে একটি জনপ্রিয় অবস্থান গড়ে নিয়েছিলেন।
উপন্যাসের প্রধান প্রাণ হলো এর ভাষা বিষাদ সিন্ধু সেই বাঁধা অনায়াসে তার লেখার গুণে পার করেছে। সমালোচক মুস্তাফা নুরউল ইসলাম বলেছিলেন, ‘ আখ্যান বিকাশে,চরিত্রে সৃষ্টিতে,সংলাপ রচনায় ও রস পরিবেশনায় এই উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করেছে। ‘
ধর্মের জাল ছিঁড়ে সকল ধর্মের মানুষই এই উপন্যাসটি পড়েছে।
(খ)নেগেটিভ দিক :
প্রথম পয়েন্ট :
উপন্যাসে ঐতিহাসিক ঘটনার পাশাপাশি কল্পনার আশ্রয় নিয়ে ঘটনাগুলোকে আরও ব্যাপ্তি নিয়ে সাজানো হয়েছে বলে অনেক ইসলামিক স্কলাররা অভিযোগ করেন। উপন্যাসের ভিতরে এমন কিছু কিছু ঘটনা আছে যা বাস্তবের সাথে পুরোপুরি মিলে না।
দ্বিতীয় পয়েন্ট :
উপন্যাসের একপর্যায়ে মনে হতে থাকে এজিদই এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু দখল করে নিয়েছে। এজিদ এন্টি হিরো হলেও সে পুরো উপন্যাস জুড়েই সে তার দাপট দেখিয়ে গিয়েছে।
তৃতীয় পয়েন্ট :
লেখক ঐতিহাসিক ঘটনাকে গতিময় ও আকর্ষণীয় করার জন্য কিছু উপকাহিনী তৈরি করেছেন,এই উপকাহিনীগুলো উপন্যাসকে প্রাণ দিলেও,কিছু কিছু ক্ষেত্রে লেখক তা অতিরঞ্জিত করে ফুটিয়ে তুলেছেন।
খুচরা আলাপ
উপন্যাস লিখতে গেলে লেখকরা কল্পনার আশ্রয় নিয়েই লেখেন। যেহেতু কারবালার ঘটনা অনেক আগেই ঘটে গিয়েছে তাই লেখকের পক্ষে হয়তো ১০০% সত্যি ঘটনা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তাই,একটি উপন্যাস হিসেবেই ইসলামের ঐতিহাসিক ওই দিনগুলো জানার জন্য এই বইটির বিকল্প কোন বই বাংলা সাহিত্যে ওভাবে আসেনি। আলোচনা ও সমালোচনা থাকবেই তবুও কিছু লেখা কখনো ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা সম্ভব না! এই উপন্যাসটিও তেমনি একটি সৃষ্টি ।
বইটি কেন আপনি পড়বেন?
সাহিত্য প্রতি যুগেই নতুন নতুন মোড়কে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। ইসলামিক ঘটনা নিয়ে তেমন কোন উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে সেভাবে সৃষ্টি হয়নি। ইসলামিক উপন্যাসে থাকতে পারবে না প্রেম! প্রেম নেই যে উপন্যাসে সেখানে থাকবে না নায়ক/নায়িকার প্রতি পাঠকদের আকর্ষণ বা টান। সেজন্য ইসলামিক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে সেভাবে স্থান তৈরি করে নিতে পারেনি। ওই সময়েও মীর মশাররফ হোসেনের অমর সৃষ্টি বিষাদ সিন্ধু সাহিত্যিক ভাব গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ রেখে অন্যান্য উপন্যাসের সাথে পাল্লা দিয়ে সমানতালে পঠিত হয়েছে। তাই ইসলামিক ঘটনাবহুল এই ঐতিহাসিক উপন্যাসটি অবশ্যই সকলের একবার হলেও পড়া উচিত।
সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ও বাঁধাই
প্রচ্ছদ বা বাঁধাই নিয়ে আমার কোন দ্বিধাই নেই এই বইয়ে,নতুন প্রচ্ছদে খুবই সুন্দর করে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে। এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন পরিচিত বড়োভাই ‘রুদ্র কায়সার’। বইটির সম্পাদনার কাজও যথেষ্ঠ ভালোভাবে করা হয়েছে।
বইতে খুব একটা বানান ভুল নেই। বইটির বাঁধাইও বেশ ভালো। সূর্যোদয় প্রকাশনীর প্রডাকশন কোয়ালিটি পাঠকদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে অনেক আগেই, এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়।
ব্যক্তিগত রেটিং
৪.৫/৫
লেখক পরিচিতি
মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন একজন বাঙালি ঔপন্যাসিক,নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। তাঁর পুরো নাম সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী ও বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ।
কারবালার যু*দ্ধকে উপজীব্য করে রচিত বিষাদ সিন্ধু তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম।
বই ফটোগ্রাফি
রুদ্র রহমান
বইয়ের নাম: বিষাদ সিন্ধু
লেখক: মীর মশাররফ হোসেন
ধরণ: ঐতিহাসিক
প্রকাশন: সূর্যোদয় প্রকাশন
প্রচ্ছদ: রুদ্র কায়সার
প্রথম প্রকাশ: ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩৬৮ পৃষ্ঠা
মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০ টাকা