প্রারম্ভিকা
ছোটো গল্পগ্রন্থের বই চোখের সামনে পড়লেই আমার প্রথম কাজ হলো যতদ্রুত সম্ভব বইটা পড়ে ফেলা । কোন ছোটো গল্পগ্রন্থ পড়লে একই সাথে দুইটি স্বত্তার ডানা ভর করে আমার মাঝে । প্রথমত,পাঠক সত্তা যা আমার খুবই পুরোনো অভ্যাস এবং দ্বিতীয়ত,লেখক সত্তা,যেহেতু আমি নিজেও থ্রিলার ও হরর জনরার ছোটো গল্প লিখি তাই গল্পটি শেষ করার পরে চিন্তার ডালপালা মেলে ধরে ভাবতে বসি গল্পটি কী যথার্থ ছিলো?
নাকি এভাবে লিখলে গল্পটি আরও পূর্ণতা পেতো । আরমান কবিরের ‘ব্ল্যাক’ বইটিতে মোট ছয়টি গল্প আছে ।
‘ হুমায়ুনের এক রাত ‘
‘ আমায় ডেকো না ‘
‘ ফেরারি ‘
‘ নক্ষত্রের মতো একা ‘
‘ কালোডাক ‘
‘ প্রেমিকার রক্ত চাই ‘
ছয়টি গল্প লেখা ছয়টি ভিন্ন প্লটে । লেখকের লেখার ধরণে একটা বৈচিত্র্য আছে যা পাঠককে আকৃষ্ট করে রাখবে
প্রথম গল্প
হুমায়ুনের এক রাত
এই গল্পটির শুরুতে গাজীপুর এবং ডিভোর্স শব্দ দুইটি পড়ে লেখক হুমায়ূনের কথা মাথায় আসতে না আসতেই সেই ভুল কাটিয়ে দেখলাম না এটা অন্য কোন এক হুমায়ুনের গল্প । হুমায়ুন ছোটো ও বড়ো পর্দার একজন ব্যস্ত অভিনেতা । ফাঁকা বাসায় সেই রাতে বিদেশি মদ গিলতে গিলতে সে তার অভিনীত সিনেমাগুলোর স্মৃতিচারণ করছিলেন আর শিউরে উঠছিলেন । অতিরিক্ত পেগ নিয়ে নেয়ার ফলে এটা সেটা এদিক সেদিক পড়ে ভেঙ্গে যাচ্ছিলো । অতিরিক্ত মদ খেয়ে রাঙ্গামাটির রাস্তার সেই কিশোরী মেয়েটা গাড়ির নিচে….ভাবতেই শরীরটা আবার শিউরে উঠলো অভিনেতার ।
হঠাৎ চোখ মেলে চাইতেই হুমায়ুন অনুভব করলেন কে যেন ঝুঁকে এসেছে তার মুখের উপর । সে সিগারেটটা হাতে নিয়ে চোখটা আবার বন্ধ করে খুলতে যাবেন,অমনি ঠান্ডা বরফের টুকরোর মতো দুটো হাত যেন হুমায়ুনের দুগাল চেপে ধরলো । আঁতকে উঠে কাচের টি টেবিলের উপরে পড়ে তার চোখের উপরে কেটে রক্ত পড়ছে । এর পরমুহূর্তেই লাল ঘাগরা পড়া এক মেয়ে তার বরফ শীতল স্পর্শে হুমায়ুনের হৃদপিণ্ডে আতঙ্ক তুলে দিলো । ভাঙ্গা কাচের টুকরো গুলো ক্ষত বিক্ষত করে যাচ্ছিলো শঙ্কিত হুমায়ুনকে একটু একটু করে । এদিকে বিদ্যুৎ চলে গেলো,হঠাৎই নিচতলায় সিঁড়ির গোড়ায় হালকা গলা খাঁকারি টাইপ শব্দ শুনে হুমায়ুন হ্যান্ডগান নিয়ে ছুটে গেলেন সচক্ষে দেখতে । বিদ্যুৎ চমকে হুমায়ুন দেখলো সিঁড়ির নিচে কালো আকৃতির বিশাল লোমশ কোন প্রাণি। হুমায়ুনের কাছে মনে হলো এটা নেকড়ে! কিন্তু জঙ্গলহীন এই এলাকাতে নেকড়ে আসবে কীভাবে?
হুমায়ুনের পায়ের কাছে যে মেয়েটার স্পর্শ সে পেলো সে কী সেই মেয়েটা?
নাকি চেনা কোন প্রিয়জন এই রাতে তাকে নিয়ে খেলতে নেমেছে ?
জানতে হলে গল্পটি এক নিঃশ্বাসে
পড়ে শেষ করে ফেলতে হবে পাঠককে ।
ব্যাক্তিগত রেটিং — ৩.৮/৫
গল্পটি নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া
গল্পটি বইয়ের প্রথম গল্প হওয়ার অন্যতম বড়ো সুবিধা যদি বলি তাহলে বলতে হবে পাঠক এই গল্প পড়ার পড়ে ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে আরও চমকপ্রদ গল্প পড়ার সুযোগ পাবে । গল্পটি পড়ে মনে হচ্ছিলো গল্পটি নিজেই চাইছিলো আরও কিছুটা ডানা মেলে ধরতে তার নিজস্ব প্রয়োজনেই,কিন্তু গল্পটি শেষ হয়ে গেলো একটা অপূর্ণতার দাগ কেটে । শেষটা অনেকটা ওপেন এন্ডিং,পাঠক অনেক কিছুই কল্পনা করে নিতে পারবে ।
গল্পটি আরও ডেপথ পেলে হতে পারতো বেশ ভালো গল্প,যা শেষ পর্যন্ত হয়নি ।
দ্বিতীয় গল্প
আমায় ডেকো না
ট্রেনের নয় নাম্বার কেবিনে চারজন যাত্রী এসে বসেছেন । সময়ের আবর্তনে একে অপরের সাথে কথা বলে পরিচিত হয় তারা,তাদের চারজনের নাম যথাক্রমে কোহিনূর,নয়ন,সেলিম এবং খসরু । যার বর্ণনাতে গল্পটি আগাচ্ছে,কোহিনূর একজন জনপ্রিয় লেখক যিনি ‘এক কফিন ভালবাসা ‘ বইটি লিখেছেন ।
নয়ন একজন ব্যাংকের কর্মকর্তা যিনি ঢাকায় থাকেন । সেলিম ‘ধূমকেতু ‘ প্রকাশনীর কর্ণধার । খসরু একজন গবেষক । ট্রেন তার আপন নিয়মে চলছে অন্যদিকে চারজন তার আড্ডা জমিয়ে ফেলেছে । গবেষক খসরুর মুখে নেক্রোমেন্সির কথা শুনে বাকী তিনজন মনোযোগ খরচ করে তার কথা শুনতে থাকেন । খসরু জানান, নেক্রোমেন্সির আরেকটি শাখা আছে যা দিয়ে অনন্ত জীবন লাভ করার চর্চা করা হয় ।
তার এসব চর্চার কথা শুনে অন্যরা মিথ বলে সরব হওয়াতে খসরু সাহেব চটে গিয়ে প্রমাণ দিতে চাইলেন ।
ফ্যাচফ্যাচে কন্ঠে হাজার বছরের কোন শ্বাসকষ্টের রোগীর মতো করে খসরু হিজিবিজি একটি লেখা ডায়েরি থেকে পড়তে লাগলেন,
‘রইইলিয়া কওরবাহা
নাফিলিয়া আখ্রাহা
বাহামিত বারযাখা
হায়াফিলি হায়াফিলি। ‘
এরপর কী ঘটে যায় সেই যাত্রীদের সাথে?
ধ্রিম ধ্রিম শব্দে ঢাক বাজাচ্ছে অদূরে কারা?
যাত্রী চারজন কী সবাই বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছিলো সেই জগত থেকে?
এই সকল প্রশ্নের উত্তর গল্পটি পড়ে শেষ করার পরেই পাঠক অনুধাবন করতে পারবে ।
ব্যাক্তিগত রেটিং — ৪.৬/৫
গল্পটি নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া
ট্রেন ভ্রমণ যেমন আমার প্রিয় একটা বিষয় তেমনি ট্রেন রিলেটেড গল্পও আমাকে খুবই আকর্ষণ করে ।
এই গল্পটি বেশ ভালো ডেপথ নিয়ে লেখা হয়েছে । গল্পটি রহস্য বহন করে যাচ্ছিলো এবং শেষের দিকে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে রুপ নিয়ে নেয় । গল্পটি পাঠককে পরবর্তী গল্পগুলো পড়ার জন্য আকৃষ্ট করে রাখার জন্য যথেষ্ঠ । সেই রাতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনা প্রবাহ লেখক কোহিনূরের চোখ দিয়ে আরমান কবির ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন । বাকী দুজন যাত্রীর সেই ঘটনা মনে না থাকা গল্পটিকে একটু জলঘোলা করে ফেলছিলো । তবে পরিশিষ্ট অংশ পড়ে পাঠক বুঝতে পারবে তারা কেন গোলকধাঁধার চত্ত্বরে ঘুরে বেড়িয়েছিল সেই রাতে ।
তৃতীয় গল্প
ফেরারি
জন্মসূত্রে আমেরিকান শামস কোহিনূর এর বাবা আলমাস কোহিনূর এশিয়ান হয়েও আমেরিকায় এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে । আমেরিকায় এসে শার্প শুটার আলমাস কোহিনূর শুরু করেন অদ্ভুত এক পেশা । সে তার বন্ধু আলবার্তোকে সঙ্গী করে গড়ে তোলেন AOD (Angel Of Death) । গুপ্তহত্যাকারীর ছেলেও বড়ো হয়ে বাবার সংগঠনে জায়গা করে নেয় তার দক্ষ প্রতিভায় । শামস কোহিনূর মাত্র উনিশ বছর বয়সেই মার্ডার ইনক এর টপ বস রাফেলোর কপাল বুলেট দিয়ে বিদ্ধ করে নিজেকে বাবার উত্তরসূরী হিসেবে জানান দিয়ে দেয় । সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন
শামস কোহিনুর যখন এঞ্জেল অফ ডেথ নিজেকে বের করে নিয়ে আসতে চাইছিলো,তখন তাকে হত্যা করার জন্য তার পিছনে আর লেগে পড়ে আরেক কুখ্যাত খুনি গোস্ট । যাদের সাথে জীবনে প্রথমবারের মতো গোস্টের সাক্ষাৎ হয়েছিলো তারা আর মুখ খোলার সুযোগ পায়নি । তবে কী শামস কোহিনূরের ভাগ্যেও তেমন কিছু লেখা আছে ?
গোস্টের বিচিত্রময়ী জীবন যেখানে ভয় বলতে কোন শব্দের স্থান নেই,সে নিজেই একটা আতঙ্ক । এক্সপি ১০০ হাতে গোস্ট তৈরি । হাত তার অনড়, রক্তে নেই তার কোন চঞ্চলতা । শামস কোহিনূরের সাথে জর্জিনার অন্তরঙ্গতার সময়ে ব্যাঘাত হিসেবে গোস্টের ছোড়া গুলি কি শামসের বুক ছিদ্র করতে পেরেছিলো?
রণক্ষেত্র পালার সমাপ্তি রেখা টেনে
সত্তরোর্ধ্ব স্পিডোমিটারের কাটা নিয়ে
E9 ছুটে চলেছে,সিগারেট ধরা হাতটা জানালার বাইরে ঝুলিয়ে দিয়ে রাতের নোনা ঠান্ডা বাতাস ফুসফুসে স্থান করে দিলো কে ?
কোহিনূর নাকি গোস্ট ?
জানতে হলে গল্পটি এক নিঃশ্বাসে
পড়ে শেষ করে ফেলতে হবে পাঠককে ।
ব্যাক্তিগত রেটিং — ৪.৩/৫
গল্পটি নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া
বিদেশি প্লটে ওয়েস্টার্ন ধাঁচের একটি গল্প এটি । গল্পটি তার নিজস্ব মহিমায় লেখকের সুন্দর বর্ণনায় ধীরে ধীরে ডাল পালা ছড়িয়ে যাচ্ছিলো । মাসুদ রানা সিরিজ যারা পড়েছে বা হলিউডের মুভি যারা নিয়মিত দেখে তাদের মনে এই গল্পটি তেমন আলোড়ন নাও তুলতে পারে । গল্পটির আরও অনেক ডেপথ হয়তো প্রয়োজন ছিলো কিছু বিষয়ের স্পষ্টতা আরও নিপুণ হাতে তুলে ধরার জন্য ।
চতুর্থ গল্প
কালোডাক
ইমতিয়াজ বারী ভীষণ একরোখা লোক ছিলেন । ছেলে আরিফের দৃষ্টিতে তার বাবা বেঁচে থাকতে তার হাড়মাংস ঝুরঝুরে করে তোলার জন্য এমন কিছু নেই যা তিনি করেননি । বাসা থেকে অভিমান ও রাগে পালিয়ে মাজারে আশ্রয় নিয়ে দিনানিপাত করছিলো আরিফ ।
সিলেটের সেই মাজার ছেড়ে চোরই পথে বর্ডার পার হয়ে ভারতে পাড়ি জমায় আরিফ । একটু আধটু বিয়ার খাওয়া যার নেশা ছিলো সে ভারতে গিয়ে পুরুষ মনের সবচেয়ে বড়ো নেশা প্রেমে পড়ে যায় ।
অপর্ণা মেয়েটি আরিফের চোখে তার জীবনে দেখা সেরা সুন্দরী,যে সপ্তর্ষি মন্ডলের খসে পড়া কোনো দামী অংশ ।
ভারতে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার বশবর্তী হয়ে পালিয়ে আবার নিজের জন্মভূমিতে ফিরে আসতে বাধ্য হয় আরিফ ।
দেশে ফিরে এগারো বছরের সাধনায় প্রকৌশলী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সম্পূর্ণ নতুন পরিচয়ে ধরিত্রীর অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে আছে আরিফ । এখন তার বউ,বাচ্চা,টাকা পয়সা, জনপ্রিয়তা সবই আছে । সমস্যা বাধে তখনই যখন একটি নীল খাম তার হাতে পৌঁছে । যে চিঠিতে আরিফের পূর্বের জীবনের পাপের কালো কোন অধ্যায় কেউ স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের আভাস তার কাছে ছড়িয়ে দিয়েছে ।
কে তাকে এই বেনামী পত্রটি পাঠালো?
এতো কষ্টে গড়ে তোলা এই সাম্রাজ্য কেউ কি কখনো হারাতে চায়!
দেশের বিত্তবান শ্রেণির বিপদের বন্ধু খ্যাত কারিগরের সান্নিধ্যে আরিফ কি পারবে তার সেই পুরোনো কালো অধ্যায় ঢেকে রাখতে ?
এই সকল প্রশ্নের উত্তর গল্পটি পড়ে শেষ করার পরেই পাঠক অনুধাবন করতে পারবে ।
ব্যাক্তিগত রেটিং — ৩.৬/৫
গল্পটি নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া
এই গল্পটির প্লট সেই অর্থে খুবই দুর্বল ।
ব্ল্যাকমেইল রিলেটেড গল্প এই বয়সে পড়লে খুবই কমন প্লট বলে বিবেচিত হয় । গল্পটির গন্ডি বাংলাদেশ থেকে ভারত ছড়িয়ে গেলেও গল্পটির রেশ ধানমন্ডি থেকে শুরু হয়ে যেন কলাবাগানেই থেমে গেছে,শাহবাগ পর্যন্ত আসতে পারেনি ।
গল্পটির শুরুটা খুবই সাদামাটা ভাবে শুরু হলেও মাঝের দিকে মনে হচ্ছিলো গল্পটি তার নিয়মেই জমে উঠবে কিন্তু শেষটা তেমন হয়ে উঠতে পারেনি ।
পঞ্চম গল্প
নক্ষত্রের মতো একা
অ্যান্টার্কটিকার এক দুর্গম অঞ্চল, আশেপাশে যতদূর চোখ যায় সফেদ বরফের রাজত্ব । আমেরিকার আলফা বেজ আইস স্টেশন আমেরিকার আইস স্টেশন,ডিপ নেইচার এক্সপ্লোরেশনে (ডিএনই) এর ছয় জনের একটি দল সেখানে যায় । সবচেয়ে দুর্গম লেক ভলক্যানো থেকে আরও কিছু মাইল দক্ষিণে সেই আলফা বেজ স্টেশনের অবস্থান । আলফার ল্যাবে সেই দল খুঁজে পায় একটা স্টেইনলেস স্টিলের বাক্স এবং একটি চিঠি । ঘটনা তার নিয়মেই আগাতে থাকে এরপর অ্যান্টার্কটিকায় মাউন্ট জেলিতে পাওয়া যায় একটি মৃতদেহ,দেহটি কার?
ডক্টর রোমান্সের মৃতদেহ নয়তো?
সেই চিঠিতে কী এমন লেখা আছে যা উন্মোচন করে দিবে তাদের সামনে এক অদ্ভুত জগৎ !
ভিনগ্রহবাসী ও তাদের সাথে যোগাযোগের যোগসূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন ডক্টর রোমান্স । T99 এমন একটি জগৎ যা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে কিছু,ডক্টর রোমান্সের সেই ভিনগ্রহের খোঁজ কি পাবে শেষ পর্যন্ত সেই পর্যবেক্ষণকারী দলটি?
ভিনগ্রহের সেই প্রাণীর মুখোমুখি হতে গেলে যদি বরণ করে নিতে হয় মৃত্যুকে,
এই ঝুঁকিকে মেনে নিয়ে তারা কী এগিয়ে যাবে এই গবেষণা?
জানতে হলে গল্পটি এক নিঃশ্বাসে
পড়ে শেষ করে ফেলতে হবে পাঠককে ।
ব্যাক্তিগত রেটিং — ৪.৭/৫
গল্পটি নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া
অনেক দিন পরে দুর্দান্ত একটি সাইন্স ফিকশন গল্প পড়লাম । লেখকের বর্ণনা, সৃষ্টিশীল জগৎ,পরবর্তী পদক্ষেপে ঘটে যাওয়া সমূহ সম্ভাবনা সব কিছু গল্পটিকে প্রাণসঞ্চার করে গিয়েছে বারংবার । অ্যান্টার্কটিকার সৌন্দর্য লেখক বেশ নিপুণ হাতে এঁকেছেন তার এই গল্পে ।গল্পটির বেশ ভালো ডেপথ পেয়েছে,T99 জগৎ পাঠককে নতুন কোন শিহরণ দিয়ে যাবে ।
ষষ্ঠ গল্প
প্রেমিকার রক্ত চাই
প্রেম অবিনশ্বর কথাটা সবসময়ের জন্য কি সত্যি ? কখনোই না,প্রেম অপ্রেমে বদলে যায়,শাখা ও প্রশাখার বাইরেও আগাছা জন্মায় ! গল্পে প্রেমিক শাহেদের কাছে পুরো পৃথিবী জুড়ে আছে একটি মেয়ে,যার নাম শেলী । সে জাফর নামের একটি ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায় যার ফলশ্রুতিতে বলি হতে হয়ে একটা প্রেমিক পুরুষকে । শাহেদকে,শেলী ও তার নতুন প্রেমিক জাফর মেরে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে তাদের পথের কাটা উঁপড়ে ফেলে । অন্যদিকে,শেলী তার নতুন প্রেমিকের সাথে শরীর নিয়ে খেলায় মত্ত,তার পুরোনো প্রেমিকের সব স্মৃতি যে ভুলে গেছে । শাহেদ কবর থেকে উঠে আসতে চাইছে সে শেলী ও জাফরের অন্তরঙ্গ দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছে না! শাহেদের সারা শরীরে পোকা কিলবিল করছে,নাকের ফুটো দিয়ে মাটি গলা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে । প্রেমিকার প্রতি রাগ ও ক্ষোভ জ্বালানি হিসেবে তার প্রতিশোধ স্পৃহাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিলো ।
শেষমেশ,মাটি ফুঁড়ে শাহেদ সদ্য উৎক্ষিপ্ত স্পুটনিকের ন্যায় বেরিয়ে আসে । শাহেদ আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘শেলী, পালাও শেলী, পালাও। আহহা হা হা…! ‘
দেড় দিনের লাশ কবর থেকে উঠে প্রতিশোধ কড়ায় গন্ডায় নিতে পারবে তো?
শেলী কি শেষমেশ বুঝতে পারবে তার প্রাক্তন প্রেমিককে মেরে ফেলার ভয়াবহতা?
এই সকল প্রশ্নের উত্তর গল্পটি পড়ে শেষ করার পরেই পাঠক অনুধাবন করতে পারবে ।
ব্যাক্তিগত রেটিং — ৪.৮/৫
গল্পটি নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া
গল্পটি পড়ার শুরুতে পাঠক রোমান্টিক কোন গল্প পড়ছে বলে ধারণা করে ফেলবে,গল্পে শেলীর আচরণ,বর্ণনা শুনে কল্পনায় তার প্রেমিকার সাথে কানেক্ট করার চিন্তা করে ফেলবে । কিন্তু গল্পের মাঝে এসে তাদের হৃদয়ের আয়না ভেঙ্গে যাবে শাহেদের করুণ পরিণতি দেখে ।
গল্পটি রোমান্টিকতা দিয়ে শুরু হলেও এটি শেষে এসে হররে রুপ নেয় । গল্প শাহেদের যন্ত্রণা,আকুতি,ব্যর্থতা,হৃদয় ভাঙ্গার যে গান লেখক গেয়েছেন তা যে কোন প্রেমিকের বুকই ছিদ্র করে যাবে ।
বইটির সার্বিক পাঠ প্রতিক্রিয়া
প্রথম পয়েন্ট :
লেখকের লেখনীশৈলী আমাকে অভিভূত করেছে । কয়েকটা গল্পে তার লেখার বর্ণনা,দৃশ্যপট,ভাষার প্রয়োগ ইত্যাদি পাঠককে আপ্লুত করে তুলবে । কিছু সংলাপে ও কথাবার্তায় ন্যাটিভ যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তা পড়ে মনে হয়েছে বাস্তবে ঘটে যাওয়া কোন দৃশ্য লেখকের তা তিনি অনুপম হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন ।
দ্বিতীয় পয়েন্ট :
বইটির গল্প কথকের ভূমিকায় কয়েকটি গল্পে শামস কোহিনূরের উপস্থিতি এবং তার বিভিন্ন গল্পে ভিন্ন ভিন্ন সত্তা দু্র্বল পাঠককে কনফিউশনে ফেলে দিতে পারে । একই নামের একজন এতো ভূমিকায় না আসলেই হয়তো ভালো হতো । প্রথমে লেখক,তারপর হয়েছেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ত্রাশ আবার শেষে তিনি হয়েছেন পর্যবেক্ষণকারী দলের সদস্য গবেষক হিসেবে ।
শামস কোহিনূরকে ‘ এক কফিন ভালবাসা ‘ বইয়ের লেখক হিসেবেই বেশ লেগেছে ।
তৃতীয় পয়েন্ট :
প্রায় প্রতিটি গল্পের মাঝের অংশে লেখক বরাবরই তার স্বমহিমা ধারা বজায় রেখেই লিখেছেন । তবে কিছু গল্পের এন্ডিং আরও চমকপ্রদভাবে শেষ হতে পারতো,যা পড়ার পড়ে হয়তো একটু আক্ষেপই রয়ে গেছে । লেখক ভবিষ্যতে এই দিকটা মাথায় রেখে আরও সমৃদ্ধ গল্প লিখবেন এই প্রত্যাশা করাই যায় ।
এই লাইনে ‘ ব্ল্যাক ‘ নিয়ে বলতে চাইলে বলবো, ‘ হুমায়ুনের এক রাতে নক্ষত্রের মতো একা,ফেরারি হয়ে আমায় ডেকো না,কালোডাকে বলেছি আমি প্রেমিকার রক্ত চাই ! ‘
বইটি কেন আপনি পড়বেন?
লেখকের বর্ণনাশৈলী,তার লেখার ধরণ এবং তার সামগ্রিক চিন্তাভাবনাকে ধারণ করার জন্য বইটি আপনি পড়বেন ।
সম্পাদনা,প্রচ্ছদ,বাঁধাই
বইটি হাতে নিয়ে কভার পেজটা নেড়েচেড়ে দেখে আমার মনে হয়েছিলো এতো মোটা কভার পেইজ লাস্ট কবে ধরেছিলাম,মনে নেই । নবকথন প্রকাশনীর থেকে প্রকাশিত বইটির প্রোডাকশন টপ নচ হয়েছে,বইটি হাতে নিলে যে কোন পাঠকই এই মন্তব্য করতে বাধ্য । বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন ‘ জুলিয়ান ‘ ভাই,যা ব্ল্যাক নামটির সাথে পুরোপুরি সখ্যতা করে ফেলেছে । বইটির বাঁধাই ও ছিলো বেশ মজবুত । সম্পাদনাও বেশ ভালো হয়েছে গণনার বিচারে বানান দু’চারটা ভুল হয়েছে ।
বইয়ের নাম: ব্ল্যাক
লেখক: আরমান কবির
ধরণ: থ্রিলার
প্রকাশন: নবকথন প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: জুলিয়ান
প্রথম প্রকাশ: ২০২৪
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৫২
মুদ্রিত মূল্য: ৩৬০