Home থ্রিলার পাঠ আলোচনায় ‘অসময়’

পাঠ আলোচনায় ‘অসময়’

পাঠ আলোচনায় ‘অসময়’
জমির উদ্দিন, শারমিন, জামিউল, আজহার দেওয়ান, সাহিব উদ্দিন, যাবের দেওয়ান, ইমামপুত্র, জহুরুল, রোকসানা, সগীর মিয়া, চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান খান, ইদ্রিস হাওলাদার, তারানা, বজলুর রহমান বাবু, জব্বার হোসেন, আওলাদ হোসেন, দিলওয়ার, আফজাল, রমিজ উদ্দিন, সোবহান উদ্দিন, তমিজ মোহাম্মদ, পীর শাহ আলী লুতফর রহমান বাবু, জাহানারা বেগম, হালিম, মোনায়েম ব্যাপারি, আসগর আলী, নূপুর, অপি, শিফন, আসিফ, সৈয়দ রইসুল আলম, সৈয়দ আশেকুর রহমান, আশা, লতা, আয়েশা, তারেক, মুন্না, তৈয়বা জাহান নিলুফা, ইজ্জত খন্দকার, আমির হোসেন, মাওলা, জয়নাব, সৈয়দ আহমদ উর রহমান, সৈয়দ রাজ্জাকুর শাহ হাসন, মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ, যতীন মোহন বাগচী, বিজু, পায়েল, আখলাক, আবুল খাঁ, মজিদ খাঁ, জাহাঙ্গীর, ইছমত, জামসেদ আলী, হারুন মুনসি, ফাইজা, জামিলা, আহসান, রেদোয়ান, বাতেন মোল্লা, হাসিনা বেগম, সোলেমান, বদিউল হোসেন, পরীবানু, কাদের দেওয়ান, রহিমা, নমিউল হক, মোসলেম, বিলকিস বানু, তিন্নি, রঙ্গ ভাবী, জহির দেওয়ান, রাইসু, তসলিমা, সোবহান আজগর, লুসিফার, ম্যামোন, এসমৌডিয়াজ, আজাজিল, মরিয়ম, ইবলিশ, ইনিয়াত…
 
২৪০ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাসে ৮০টিরও বেশি চরিত্র! বেশিরভাগ চরিত্রের পরিচিতি উপন্যাসের প্রথমার্ধেই তুলে ধরা হয়েছে। আবার প্রতিটি চরিত্রের নাম-পরিচয়, বর্ণনা ছাড়াও রয়েছে তাদের পৃথক গল্প-কাহিনি। এগুলো পড়তে বা মনে রাখতে কেমন লাগবে? আমার কাছে তেমন ভালো লাগেনি। অসংখ্যবার বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে। চরিত্র এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক মনে রাখা যাচ্ছিল না। চরিত্রগুলো ঘিরে অসংখ্য গল্পের শাখা-প্রশাখা এবং সেগুলোর বর্ণনায় ফোকাস ধরে রাখাও মুশকিল হয়ে পড়েছিল। গল্প কোনদিকে মোড় নিচ্ছে, কেন নিচ্ছে, কোনো ঘটনা আগামীতে মূল কাহিনিতে কোনো ইম্প্যাক্ট ফেলবে কি-না তা সনাক্ত করা যাচ্ছিল না। সর্বশেষ চরিত্র এবং কাহিনি নিয়ে এমন কনফিউজড হয়েছিলাম টিভি সিরিজ ‘গেম অফ থ্রোন্স’ দেখার সময়। আর বইটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল তারই বাংলা ভার্সন দেখছি, দ্বিপুবাগ ভার্সন আরকি!
 
শুনতে একটু অবাক লাগলেও আমার মস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে গেছে ‘অসময়’ বইয়ের মূল কাহিনি কী নিয়ে! কেননা এত এত চরিত্র, আর চরিত্রগুলোর পৃথক গল্প-কাহিনি কোনোভাবেই মূল কাহিনিতে ফোকাস রাখতে দেয়নি। যখন কোনো একটা গল্পের অংশ মনে রাখার চেষ্টা করেছি, পরবর্তীতে দেখা গেছে কাহিনিতে সেই গল্প আর এগোয়নি। তারপরও একেবারে সংক্ষেপে যদি কাহিনির চুম্বক অংশ বলতে হয়, তাহলে বলব- দ্বিপুবাগ নামের একটি গ্রাম আর সেখানকার মানুষের জীবন-পরিণতি নিয়ে এই উপন্যাস। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই গ্রামে বসবাসরত মানুষেরা নিজেদের লোভ-লালসা, ক্ষমতার অপব্যবহারে নিজেদের জীবনেই ডেকে আনে ঘোর বিপদ। কাহিনির এক পর্যায়ে দেখা যায় অমূর্তলোকের রাজপুত্ররা হঠাৎ মূর্ত হয়ে উঠে গ্রামবাসীদের জীবন গ্রাস করে নিতে থাকে। ধেয়ে আসে মহাপ্রলয়, অসময়। কেন এই অসময়ের আগমন? এত জায়গা থাকতে দ্বিপুবাগই কেন? এর পেছনে কাদের হাত রয়েছে? এ নিয়েই আবর্তিত হয়েছে এই উপন্যাসের গল্প-কাহিনি।
 
প্রচণ্ড ধীরগতির এই উপন্যাসটির জনরা ধরা হয়েছে অতিপ্রাকৃত থ্রিলার উপন্যাস। তবে এখানে বৈচিত্রও রয়েছে। অতিরিক্ত চরিত্র ও বর্ণনার দরুণ বইটি পড়ার গতি মন্থর হলেও ১৫১ পৃষ্ঠা বা ২২তম অধ্যায় থেকে কাহিনির গতি হুট করেই বেড়ে যায়। এরপর আর কোথাও স্লো মনে হয়নি। একদম শুরুর দিকে, প্রারম্ভ অধ্যায়ে রহস্যের যে জাল বোনা হয়েছিল, তা আগ্রহ বাড়িয়ে দিলেও পরবর্তীতে কাহিনির সঙ্গে এর কোনো ছক মেলাতে পারিনি। বরং পরবর্তী অধ্যায়গুলো সামাজিক উপন্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে তা গ্রামীণ রাজনীতির দিকে ধাবিত হয়েছে। এসেছে রহস্য, ষড়যন্ত্র, অতিলৌকিকতা। শেষদিকে পৌরাণিক ইতিহাসের মিশ্রণ কাহিনিকে আবার ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
 
বইয়ের দুর্বল দিকসমূহ:
১। অতিরিক্ত চরিত্র। পাঠকেরা পড়লে বুঝতে পারবেন বইতে এতগুলো চরিত্রের মোটেও দরকার ছিল না। তার উপর সবগুলোর চরিত্রের আলাদা গল্প-বর্ণনারও প্রয়োজন ছিল না।
 
২। বইতে বেশকিছু বানান ভুল ছিল। তার চাইতেও দুর্বল ছিল সম্পাদনা। সঠিক সম্পাদনা করলে বইটির কলেবরও আরেকটু কমানো যেত। অসঙ্গতি ছিল বেশ। তন্মধ্যে দু’টি পৃথক উদাহরণ দিই। এক জায়গায় লেখা- ‘জমির হাতে হা মেলালো।’ সঠিক বাক্যটি হবে- ‘জমির হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলালো।’ আবার একটি বাক্য এমন ছিল- ‘জমির বড় দাম জমির ভাই।’ বাক্যটি পড়তে সঙ্কোচ লাগে। যেহেতু দুজনের মধ্যে কথোপকথন হচ্ছে, এটা এভাবে লেখা যেত- ‘জমির বড় দাম, ভাই।’
 
৩। যেই দ্বিপুবাগ নিয়ে কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, সেই গ্রাম ও স্থানের সঠিক বর্ণনা ছিল না। ফলে কোনোকিছুই কল্পনা করা যায়নি। কোথায় কী হচ্ছে, শুধু পড়েই গেছি। অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি। আজহারের চেতনা অংশে যে অমূর্তলোকের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেটা পড়ার সময় কেবলই মনে হচ্ছিল টিভি সিরিজ ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ এর কোনো পর্ব দেখছি।
 
৪। কাহিনির দৈর্ঘ্য। চরিত্রের মতো কিংবা চরিত্রের কারণে বইয়ের কাহিনিও ঝুলে গেছে। যেন বিক্ষিপ্ত অসংখ্য ঘটনার সন্নিবেশে কাহিনি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা সংকুচিত করা গেলে ভালো হতো।
 
বইয়ের শক্তিশালী দিকসমূহ:
১। চমৎকার লিখনশৈলী। বইটি পড়ে যাওয়ার পেছনে সবচাইতে বড় কারণ ছিল লেখকের লেখনশৈলী। কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না এটি লেখকের প্রথম বই। সাবলীল বর্ণনা, গল্প জমানোর অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তার। যেকারণে শেষ পর্যন্ত বইয়ে আটকে থাকতে বাধ্য হয়েছি।
 
২। শব্দচয়ন। এটাকে শুধু পাশ মার্ক দিবো। কেননা শব্দচয়ন আরও পরিমিত ও শোভন করার সুযোগ ছিল। সংলাপের বাইরে গিয়ে চরিত্রের বর্ণনায় বারংবার গালি ব্যবহারের বিষয়টা অবশ্যই এড়ানো যেত।
 
৩। প্লট টুইস্ট। কাহিনির শেষদিকে এমন কিছু আনপ্রেডিক্টেবল প্লট টুইস্ট রয়েছে, যা চমকে দিতে বাধ্য।
 
৪। কাহিনির ক্লাইম্যাক্স বা পরিণতির অংশটা এককথায় দুর্দান্ত। আর দশটা থ্রিলার উপন্যাসের চাইতে এটাকে ব্যতিক্রম ও ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে কাহিনির শেষাংশটা। যদিও কতক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এবং বেশকিছু চরিত্রের পরিণতি নিয়েও ধোঁয়াশা থেকে যায়, কিন্তু লেখক শেষদিকে এর সিক্যুয়েল বা পরবর্তী খণ্ডের আভাস দিয়েছেন। হয়তো নতুন খণ্ডে সেসকল বিষয়ের উত্তর মিলবে।
 
পরিশেষে যা বলতে চাই, ‘অসময়’ বইটি নিয়ে আমার পাঠ অনুভূতি অনেকটাই মিশ্র ধরনের। উপন্যাসটি যেমন উপভোগ করেছি, তেমনি বেশকিছু বিষয় দৃষ্টিকটুও লেগেছে। এই পাঠ আলোচনায় সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তবে আমার মনে হয়, বইটি থ্রিলারপ্রেমীদের অবশ্যই পড়া উচিত। কেননা যে ধরনের গল্প বলা হয়েছে, আর কাহিনিতে যেরকম এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে; তা সচরাচর দেখা যায় না। একদম ভিন্ন কিছুর অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে নিঃসঙ্কোচে বইটি পড়তে পারেন। হ্যাপি রিডিং।
 
ফ্ল্যাপের লেখা:
একটি পাপে সিক্ত গ্রাম, যে গ্রামে ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে, অসময়!
 
‘অসময়’ হলো সময়ের সেই পৌনঃপুনিক বিন্দু যেখানে নরকের রাজপুত্রেরা অমূর্ত থেকে মূর্ত হয়ে উঠতে শুরু করে। রহস্যময় দুই অতিমানবিক ব্যক্তিত্ব অমূর্তের এই বিভীষিকাদের এক সঙ্গে উপস্থিত করতে এবং একইসাথে পৃথিবীতে এদের অবস্থান রোধ করার পরস্পরবিরোধী ছক কষে চলেছে। তারা আসলে চাচ্ছে কী?
 
এদিকে সোবহান মিয়ার জমিকে কেন্দ্র করে দ্বিপুবাগে শুরু হয়ে গেছে ক্ষমতার একটি প্রচ্ছন্ন লড়াই। যারই অন্তীম পর্বে, ঘনবর্ষার দিনে এই গ্রামে সূচনা ঘটবে অসময়ের। উপস্থিত হবে নরকের তিন রাজপুত্র।
 
অন্যদিকে গ্রামের তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যানের মেয়ে জামাইয়ের মৃত্যু ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। চেয়ারম্যানের মেয়েটি সন্তানসম্ভবা, সে প্রায় প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখছে যে দুটো লোক তার অনাগত সন্তানকে হত্যা করবার জন্যে এগিয়ে আসছে। লোক দুটো কারা?
 
জানতে হলে পড়ে ফেলুন, ‘অসময়’!

বইয়ের নাম: অসময়
লেখক: রিফু
ধরণ: অতিপ্রাকৃত
প্রকাশন: আদী প্রকাশন
প্রচ্ছদ: আদনান আহমেদ রিজন
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৪০
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here