Home নির্বাচিত রিভিউ ‘৭১’ আর্তনাদ ও গৌরবের সংশ্লেষ

‘৭১’ আর্তনাদ ও গৌরবের সংশ্লেষ

0
‘৭১’ আর্তনাদ ও গৌরবের সংশ্লেষ

৭১। নৃশংসতা, নিপীড়ন, নিঃস্ব হবার আর্তনাদ যার অন্য নাম। এক নামে যার নাম- গণহত্যা। আরো নাম আছে একাত্তরের‌। গৌরব, তিতিক্ষা, সাধনা।

একাত্তর, একান্ত আমাদের। বাঁচতে বাঁচতে মরে পড়ে থাকা আর মরতে মরতে বেঁচে যাওয়ার আখ্যান। আমাদের লাল সবুজের সমস্তটা দেশ যুদ্ধের মরণ কামড়ের দাগ নিয়ে তার যে মানচিত্র এঁকেছে, একাত্তর তার পুঁঞ্জিভূত নির্যাস।

অন্তরাত্মায় ক্ষরণ পুষে সেই মানচিত্র থেকে দেশের উত্তরের বৃহত্তর জেলা দিনাজপুরের মুক্তিযুদ্ধ ও জেনোসাইড বিষয়ে সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম অনুসন্ধানে নিজেকে উজার করে দিয়েছেন একজন। সাহিত্য ও সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল লেখক সাদিয়া সুলতানা।

দিনাজপুরের দীঘলটারি গ্রামের চরিত্ররা উঠে এসেছে ৭১ এর ৩০৮ পৃষ্ঠায়। দরদী, নাসির, আঞ্জুয়ারা, শরীফা মাস্টারনী, ইদ্রিস মুনশি, জয়গুন বিবি, হায়াতন, নছিমন মাই, ফুলবাবু, টাট্টু মিলন, ইয়াসির, মঈন, জোবাইদা, গিরিবালা, দীনেশ, ফরিদুর, কিছমত, মনছুর, সবুজ সহ আর সকলের কান্নার চিৎকার, দাপটের প্রভাব, উৎখাতের হাহাকার, প্রত্যাবর্তনের বাসনা, ভর্ৎসনার যন্ত্রণা যুদ্ধের দামামার শব্দ ঝংকারের সাথে‌ মিশিয়ে উপন্যাসে থরো থরো আবেগের দৃশ্য এঁকেছেন লেখক।

স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে অজস্র কাজ আছে। সবকিছুর ভিড়ে সাদিয়া সুলতানার ‘৭১’ কেন পড়ব? কেন পড়ছি?

উত্তর-১:

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার তাগাদাকে ধারণ করে, লেখক আমাদের মহান সংগ্রাম নিয়ে অসংখ্য গবেষণা সাহিত্য পড়েছেন। সুদীর্ঘ দিন পথে প্রান্তরে খুঁজে ফিরেছেন যুদ্ধের অমোঘ চিহ্ন। বয়সের ছাপে শিরা ভেসে ওঠা কাঁপা হাতের পাশে অজস্র সময় বসে থেকেছেন। শেকড়ের সাক্ষীদের মুখনিঃসৃত সত্য এবং অভিব্যাক্তি জানার আর দেখার প্রত্যয় সম্পন্ন করেছেন বিপুল সাধনায়।

উত্তর-২:

‘৭১’ উপন্যাসের কাহিনি প্লট সুবিস্তৃত। শহর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের ডামাডোল গ্রামের তুলনামূলক শান্ত, নিবিড় পরিবেশে পৌঁছে যাবার পর থেকে মূলত এর শব্দ বুনন শুরু। উপন্যাসের ঠিক দুই তৃতীয়াংশে অস্ত্র সমেত যুদ্ধের প্লট ফুরোয়।

তো এরপর?

‘মেঘের পরে মেঘ’র মতো ঘনিয়ে এসে, গভীর ও গম্ভীর হয়ে ওঠা অস্তিত্বের যে সংগ্রাম যুদ্ধ বিব্ধস্ত সদ্য মানচিত্রটা করেছিল তার উপাখ্যান লেখা হয়েছে এরপর। লেখা আছে একটা দেশের জন্ম হতে কত প্রাণ আর তিতিক্ষার প্রয়োজন পড়ে তার হিসেব। স্বাধীন আকাশের সূর্য আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উঁকি দেয়ার কৌশল। বিদ্যুৎহীন জনপদে নক্ষত্রহীন আকাশ গড়িয়ে অমাবস্যা নেমে আসা আঁধারের আলাপে পাঠককে তোলপাড় অনুভূতির জলে ডুবিয়ে রাখার ব্যঞ্জনা।

উত্তর-৩:

যুদ্ধে আক্রান্ত, অবরুদ্ধ পুরো দেশের একটি প্রতিভূ হিসেবে দীঘলটারির সংগ্রামের ইতিকথা পড়া প্রয়োজন। কারণ, ছিয়ানব্বই হাজার শব্দের এই উপন্যাসে উঠে আসা অজস্র চরিত্রের গল্পগুলো দীঘলটারির মতো অন্য আরো কোনো জনপদেরও। ‘৭১’ এর গল্পগুলো প্রকৃত একাত্তরের।

‘৭১’ এর প্রতি পৃষ্ঠায় ফুটে উঠা স্মৃতি সূত্র:

নিরালা সন্ধ্যার হাহাকারের মতো করে জয়গুন বিবির কবরের বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসের শুরু। ধর্মপ্রাণ সজ্জন ইদ্রিস মুনশির মাঝে স্ত্রীর প্রতি চির সুন্দর অনুভবের রেখা ধরে দরদী আর এতিম নাসিরের সংসারের সুখচিহ্ন খুঁজে পাবে পাঠক।

হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার শিকার হয়ে স্বামীকে হারানো জোবাইদা বিহার থেকে এই দেশে এসেছিলেন। সাথে তার তিন সন্তান- ইয়াসির, ইরফান আর গুলশান।

বিহারি হিসেবে আমাদের চেনা, জানা মানুষদের মনস্তত্ত্ব খুঁজে ফিরেছেন লেখক। সেই সন্ধানে উঠে এসেছে দেশভাগ, দাঙ্গা ও মুক্তিযুদ্ধে তাদের উত্থান, পতন আর ভূমিকা।

স্বামী, সন্তান হারানো বিহারি জোবাইদার কাছে বেঁচে থাকার তাগিদে কান্নাকে বিলাসিতা মনে হতো। যেই মুলক আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে তাতে তিনি মমতা বপন করেছেন। আর সেই মুলুকের সাথে বেঈমানি করা সন্তান ইয়াসিরকে ধিক্কার দিয়েছেন মুহুর্মুহু।

জাতিভেদের এই যে সংকট, মানুষ ও মনুষ্যত্বকে কতটা পিছিয়ে দেয় তার বিস্তর চিত্র তুলে ধরেছে ‘৭১’।

ধর্মের ধুয়ো তুলে অন্য ধর্মের মানুষের ওপর আক্রমণের পাশবিক চিন্তার হৃদয়বিদারক দৃশ্য উপন্যাসের পাতায় দেখতে পেয়ে মুষড়ে পড়বে পাঠক। কখনো বা হবে ঘৃণায় উদ্বেলিত।

প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে প্রস্থানরত মানুষের পায়ের আঘাতে দীঘলটারির পথঘাট রুক্ষ হয়ে ওঠে বাংলার আর সব জনপদের মতোই। পলায়নরত সেই মানুষদের পরিবারসহ আটকে গরুর গাড়ির সঙ্গে পাটের গাঁইট দিয়ে বেঁধে দিয়েছে খানসেনাদের টহল দল। তারপর আগুন লাগিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছে তাদের ।

নির্যাতনের আর কিছু স্বরূপ বোঝাতে উপন্যাসের ২৪৮ পৃষ্ঠার কিছু অংশ তুলে লিখি বরং। ‘একদিন দেখেছে লালুয়া, মানুষ কত হৃদয়হীন হতে পারে। জনৈক বাঙ্গালী যুবককে একটি বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয়েছে। তার খুব কাছেই আর একটি খুঁটিতে বাঁধা ছিল কতকগুলো কুকুর। জনৈক খানসেনা একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে, উক্ত বাঙ্গালী যুবকের দেহের বিভিন্ন অংশ হতে মাংস কেটে খাওয়াচ্ছিল কুকুরগুলোকে’।

লেখকের বর্ণনায় এ অংশগুলো পড়ার পর, নিজেকে যুদ্ধবিব্ধস্ত একজন অসহায় ছাড়া আর কিছু ভাবা অসম্ভব।

দিনাজপুরের আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এবং বিহারি সংলাপ উপন্যাসের পটভূমিতে দুর্দান্ত মাত্রা যোগ করেছে। আঞ্চলিক ভাষায় আজাকার মানে হলো রাজাকার। তাদের বীভৎস মানসিক বিকৃতির দরুণ দীঘলটারির পথ ই যেন তার জনপদের মানুষদের গিলে খেতে আসত। যে পথে একসময় নির্ভার হয়ে হাঁটত দীঘলটারির নারীরাও।

ক্যাপ্টের সোহরাবের নেতৃত্বে খানসেনা আর রাজাকারের দল সমস্ত দীঘলটারি জুড়ে অবিশ্বাস আর অনিশ্চয়তার হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল।

বন্ধুত্বে ঘৃণা, ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদের মতো বিসর্জনে বিষিয়ে উঠেছিল সম্পর্ক। সাত সতেরো ভেবে ভেবে অবসাদে ভরে উঠেছিল জনপদের জনগণের মন।

নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে বর্ডার পেরিয়ে যেতে না চাওয়ার বাসনার সঙ্গে ফিরে আসার তৃষ্ণা তাদের হৃদপিন্ডকে চেপে ধরে রাখত পাঁজরের হাড়ের সাথে।

বিপদ সীমার দৈর্ঘ্য প্রস্থ বিবেচনায় শিয়ার শিরায় উত্তেজনার তরঙ্গ নেচে উঠেছিল মুক্তিকামী সাহসী মানুষদের। যাদের মাঝে আঞ্জুয়ারার মতো দুঃসাহসী নারীও ছিল।

আর অন্যদিকে শোকের চেয়ে পেট সত্যি হয়ে ওঠে কোনো কোনো নারীর জীবনে। তেমন নারী হায়াতন। ফুলবাবুর বউ। সোহরাবের খানসেনার দল বেয়নেটের উদ্ধত মাথা দিয়ে হায়াতনের স্ফিত পেট ছিঁড়ে দেয়। হায়াতনের গর্ভজলে উঠোনে আরেক কাঞ্চন নদী সৃষ্টির দৃশ্য পড়ে হু হু করে কাঁদবে না এমন পাঠক ধরাধামে বোধ করি বিরল।

তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়ে দরদীকে রেখে যুদ্ধে যেতে মরিয়া নাসির বিপদগ্রস্ত মানুষকে নিরাপদে নদী পার করে দিয়ে গিয়ে ফেরে মরদেহ হয়ে। দরদীর অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় রাজাকারের খাতায় নাম লেখানো নাসিরের বন্ধু মইন।

দীঘলটারির নারীরা ক্যাম্পের সেনাদের জন্য হয়ে যায় গনিমতের মাল। তাদের উপর পাশবিক নির্যাতনের বর্ণনা পড়ার জন্য সাহস সঞ্চয় করাও পাঠকের জন্য দুরূহ ভীষণ। কত ব্যথাতুর পথ পাড়ি দিয়ে আমরা স্বাধীন ভূ-খন্ড পেয়েছি ভেবে প্রাণ কাঁদে দরদীদের মতোই।

এতো দূর এসে সম্মুখ সমরের প্রান্ত বিন্দুতে পৌঁছাতে থাকে উপন্যাস। কিন্তু সে উচ্ছ্বাস উদযাপন করতে গিয়ে বাংকারে ঘটে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ। যুদ্ধ ফেরত বিজয়ী যোদ্ধা ফরিদুর বিব্ধস্ত হয়ে যায়। ভেঙে যায় জয়ের ছন্দ। স্বাধীন ভূখন্ডে মরে যায় আব্বাস।

লেখকের ভাষ্যমতে, ‘একটা ইরেজার দিয়ে কেউ যেন সব আনন্দ, সব উদযাপন ঘষে মুছে দিয়ে গিয়েছে’।

এই যে এখানটায় উপন্যাসের বাঁক বদল, এটা ‘৭১’ কে দারুণ এক ব্যাপ্তি এনে দিয়েছে। এ অংশ থেকে শেষ তৃতীয়াংশ শুরু। মনোযোগী পাঠক মাত্রই এখানটায় নড়েচড়ে বসবেন।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, তারাও যুদ্ধের বেদনা, বিস্তৃতি সম্পর্কে জানি‌। অনেকটা পড়ে এবং খানিকটা ভিজুয়ালাইজেশনের কল্যাণে। কিন্তু স্বাধীন ভূখন্ডে কতটা স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে পেরেছে বিড়ম্বিত মানুষ তার ইতিহাস বিশদভাবে আমাদের অনেকের কাছে আজও আবছা।

উপন্যাসের এ অংশে লেখক বীরাঙ্গনা নারীদের পুনর্বাসন এবং মানসিক নিদারুণ সংকট তুলে এনেছেন গভীর পর্যবেক্ষণে। গর্ভের দেবশিশুর পিতৃপরিচয়ের টানাপোড়েন পারিবারিক কাঠামোগুলোতে যে বৈকল্যের সৃষ্টি করেছিল, তা মূলত যুদ্ধ পরবর্তী আরেক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ।

‘৭১’ এর সবিশেষ উল্লেখযোগ্য অংশ- যুদ্ধশিশু। সামাজিক প্রতিকূলতার নির্মম চিত্র লেখক তুলে এনেছেন এ অংশে। একজন গর্ভধারিণী মা যখন গর্ভের শিশুর জন্মদাতার পরিচয় নিজেই জানতে পারেন না, তখন সেই মা আর দেবশিশুটি সমাজে কী ভীষণ অচ্ছুৎ বলে বিবেচিত হয় সেই করুণ সামাজিক ব্যাধি ব্যাখ্যা করাও দুঃসহ যন্ত্রণার সামিল।

শত্রুর রক্তবাহী সন্তানকে জন্ম দেয়া এবং ধর্ষক ঠিক কতজন ছিল তা নির্ণয় করতে না পেরে ভ্রুণের জন্মদাতা নির্ধারণ করতে না পারার জটিলতাগুলো তুলে এনেছেন লেখক সাদিয়া সুলতানা। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন উপন্যাসে। জানিয়েছেন, প্রকৃতির অলঙ্ঘনীয় ইশারায় জন্ম নেয়া শিশুদের অধিকাংশই দত্তকায়ন পদ্ধতিতে মায়ের কোল ছাড়া হয়েছে। অনেকে চলে গিয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউ পার হয়েছে তেরো নদী সাত সমুদ্দুর। স্বাধীন ভূখন্ডের যুদ্ধ শিশু বাদল ‘মাদার তেরেসার আশ্রম’ থেকে রায়ান বাদল গুড হয়ে অন্টারিওর ওয়াটারলুর গুড পরিবারের সদস্য হয়েছে। বাদলের মতো অনেক শিশু কানাডা, ফ্রান্স, সুইডেনের মাটি স্পর্শ করে নিজেদের ঠিকানা করে নিয়েছে। আর ওদের হতভাগী মায়েরা কে কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে ওরা জানতেও পারেনি। এই মায়েদের সঠিক সংখ্যাও অজানা।

এই করুণ দৃশ্যপটের আরো একটি দিক ছিলো এমন- পিতৃত্ব নির্ধারণ করতে পারবে না বলে, পাকিস্তানিদের বীজকে বৃক্ষে পরিণত করতে চায়নি কোনো কোনো অসহায় মা। পুর্নবাসন কেন্দ্রে আশ্রয় পাওয়া হেলেন তাদের একজন। এমন হতভাগ্য মায়েরা সম্মতি দিতো গর্ভপাতে। রাষ্ট্রেরও সম্মতি ছিল। হেলেনের মতো মায়েদের অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বের হাত থেকে পরিত্রাণ দিতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা, ক্লিনিক, ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যানড প্যারেন্টহুড, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাবরশন রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং সেন্টার কাজ করেছে।

গর্ভের ভ্রুণের জন্মদাতার পরিচয় না জানা নারীদের মাঝে নাম ছিল দরদীরও। নিজের গর্ভের ধনকে বুকে আঁকড়ে ধরে রাখতে যে পালিয়ে গিয়েছিল পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে।

লেখক তাঁর সমৃদ্ধ লেখনশৈলীতে লিখেছেন, ‘শিশুটির জন্ম-বৃত্তান্ত ভুলে দরদী দেখেছে গর্ভজাত শিশুটি সুন্দর। এই শিশু নারী দেহের মাতৃত্বের দাগের মতো সুন্দর। এই দাগের চেয়ে সুন্দর কিছু পৃথিবীতে আর নেই। এই দাগের চেয়ে পবিত্র কিছুও আর পৃথিবীতে নেই। এই দাগ পতাকার সবুজের মতো মসৃণ আর নির্মল’।

দরদী তার সন্তানের নাম রাখে ‘সবুজ’।

যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধ অতোটুকুতে আটকে থাকেনি। সম্পূর্ণ সামর্থ্য নিয়ে জেঁকে বসেছিল পেটেও। যে দরদীর বাড়িতে নছিমন মাই কাজ করে নিজের আহার মেটাতে যুদ্ধের আগে, সে দরদী পরের বাড়ি কাজ খুঁজতে যায় সেই আহারের তাগিদেই। ভর্ৎসনা জোটে। কাজ নয়, নয় আহার।

আঞ্জুয়ারার শরীরে বারুদের গন্ধ লেগে আছে। যে বারুদ দিয়ে পাকিস্তানী মিলিটারিদের ধরাশায়ী করেছে, শায়েস্তা করেছে রাজাকারদের, সেই বারুদের গন্ধ। অভাবের গোয়ার্তুমি সেই গন্ধ ধুয়ে মুছে দিতে পারে না।

পুর্নবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় কিছু পদক্ষেপ চালু হয়। বীরাঙ্গনাকে বিয়ে করলে প্রশাসন নগদ টাকা দেবে। এবং ঘর তুলে দেবে সরকারি লোকেরা। দরদীর বাবা কিসমতের আত্মহত্যার হুমকি আর সামাজিক উৎপীড়নের কষাঘাতে মনছুরের সাথে বিয়ে হয় ভাগ্য বিড়ম্বিত দরদীর। মনছুরের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে সে আরেক প্রতারিত জীবনের দুঃখভরা গল্প দরদীর।

সমাজ নারীর শরীরে নির্যতনের দাগ দেখে না। তারা নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখে জননাঙ্গের শুদ্ধতা।

এই দুঃসহ প্রহসনকে সাহস আর তেজ দেখিয়ে মোকাবেলা করতে করতে দরদী আর আঞ্জুয়ারা জেনে যায় ওদের যুদ্ধটা আজও শেষ হয়নি।

যুদ্ধটা সত্যিই অশেষ থেকে যায় যেদিন মায়ের হাতের নাগালে থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সবুজ চারিদিক কাঁপিয়ে চিৎকার করে গর্ভধারিণী দরদীকে বলে ওঠে, ‘খাংকি মাগি’।

লাশ আর শহিদের পরিচয় দিয়ে লেখক ‘৭১’ এ দাড়ি টেনে রেখে দিয়েছেন রেশ।

বুকে যে ভীষণ ভারী ব্যথার অনুভব আর প্রবল কান্নার বোধ নিয়ে পাঠক ‘৭১’ জাপটে ধরে রাখে, উপন্যাসের সেই শেষ লেখক কী করে টেনেছেন তা অনুধাবন করতে ‘৭১’ তিনবার পড়েছি আমি।

আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে সাদিয়া সুলতানা সমাদৃত নাম। দেশভাগ, দাঙ্গা, মুক্তিযুক্ত না দেখা এই মানুষটি ইতোমধ্যে তিনটি বই লিখেছেন যুদ্ধকে আবর্তন করে। সবের মধ্যে ‘৭১’ তাঁর সুদীর্ঘ সময়ের সাধনার কাজ। নিবিড় সাধনায় সৃষ্টি সম্ভব।

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ক্ল্যাসিক এই কাজ সমাদৃত হবার মিছিলে সম্মুখে থাকবে এই প্রত্যাশা সুদৃঢ়।

বইয়ের নাম: ৭১
লেখক: সাদিয়া সুলতানা
ধরণ: মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস
প্রকাশন: গ্রন্থিক প্রকাশন
প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান
প্রথম প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০২৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩০৮
মুদ্রিত মূল্য: ৭৫০ টাকা

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here