Home অতিপ্রাকৃত ও ভৌতিক অদ্ভুত আঁধার এক; একটি অতিপ্রাকৃত রহস্য

অদ্ভুত আঁধার এক; একটি অতিপ্রাকৃত রহস্য

অদ্ভুত আঁধার এক; একটি অতিপ্রাকৃত রহস্য
অদ্ভুত আঁধার এক - মনোয়ারুল ইসলাম

তুই আমাদের সন্তান। আমরা তোকে প্রাণ দিয়েছি। আমাদের টিকে থাকতে হবে…

মানুষের মাধ্যমেই আমাদের টিকে থাকতে হবে।
নিজেকে টিকিয়ে রাখার এই লড়াই চলছে সৃষ্টির শুরু থেকে, চলবে শেষ পর্যন্ত। নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সুযোগ নেই। পৃথিবীটা ভালো এবং মন্দের, আলো এবং আঁধারের। এখানে সবাই টিকে থাকতে চায়‌ ।

‘ অদ্ভুত আঁধার এক ‘ একটি অতিপ্রাকৃত উপন্যাস। লেখক মনোয়ারুল ইসলাম এর বেশিরভাগ অতিপ্রাকৃত উপন্যাসই আমার পছন্দের। এই বইটাও আমাকে হতাশ করে নি। দারুন উপভোগ্য একটা বই ছিল এটা ‌‌। রাতের বেলা যখন নিজের রুমে একা একা বইটা পড়ছিলাম, ভূত প্রেতে অবিশ্বাস করা আমার গা শিউরে উঠছিল। বইটায় পদে পদে রয়েছে দারুণ রোমাঞ্চকর রহস্য ‌। বইটার শুরু থেকেই একটা মিশ্র অনুভূতি অনুভব হতে শুরু করেছিল। একদিকে ভয় হচ্ছিল আরেকদিকে ঘনীভূত হচ্ছিল রহস্যের জাল। “অদ্ভুত আঁধার এক” শুদ্ধ ভূতের গল্প নয়, এটা একটা হরর ফ্যান্টাসি।

বইটির ভূমিকায় লেখক উল্লেখ করেছেন উনার ভয়ের উৎস সম্ভবত অন্ধকার থেকে। বইটিতে উনি রহস্যের সাথে অন্ধকার এর একটি দারুন সংমিশ্রণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন।

মূল চরিত্র রতন। ছোট বাচ্চারা রতনকে দেখলে ভয় পায়। রতনকে প্রতিদিন দেখে যারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে তারা ছাড়া ওকে কেউ স্বাভাবিক ভাবে দেখতে পারে না, সবাই ভয় পায়। কারণ রতনের শরীরের উপরের অংশ মানুষের মতো কিন্তু নিচে পা নেই ‌, আছে লেজের অংশ। রতনের বাবা সর্বপ্রথম ওকে কোলে নিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন, তারপর থেকে আর তার হদিস পাওয়া যায় নি। রতনকে আগলে রেখেছিলেন তার মা মতিয়ারা বেগম। এই মতিয়ারা বেগমকে রতন অনেক ভালোবাসে, মা তাকে প্রতিদিন বাজারে নিয়ে যায় আর নিয়ে আসে, সব কাজে এই মা ছাড়া কেউ সাহায্য করে না। রতনের পরিবারের আরেকজন হলো শেফালি সে রতনের ভাবি। রতনের চাচাতো ভাই এর বউ শেফালি। এই তিন চরিত্র নিয়ে গল্প শুরু হয়ে আস্তে আস্তে এগোতে থাকে। গল্পে দেখা মেলে সেই অদ্ভুত প্রাণ এর ।
এসময় টিনা আর কায়সার আসে হেমনগরে। নিরঞ্জন ডাক্তারের দাদার বাড়িতে থাকতে শুরু করে তারা। নিরঞ্জন ডাক্তার গ্রামের নামী ব্যাক্তি, গ্রামের সকলে মান্য করে চলে তাকে। টিনা আর কায়সারের নতুন বিবাহিত জীবন শুরু হয় সেখানে। কিন্তু এরপর থেকেই টিনার অদ্ভুত লাগতে শুরু করে। প্রথমকদিন বেশ কেটে গেলেও অস্বস্তি শুরু হয় পরে। বিভিন্ন অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয় টিনা। সন্দেহ ঢুকে যায় কায়সারের মনেও।

এভাবে গল্প এগোতে থাকে। মিজান খুড়ো, নরেন, সুমন সহ আরো কিছু চরিত্রের আগমন ঘটে। কিন্তু চরিত্র গুলো গল্পটাকে যেন আরো প্রাঞ্জল করে যাচ্ছিল। সবমিলিয়ে দারুন একটা অতিপ্রাকৃত উপন্যাস ‘অদ্ভূত আঁধার এক’ ।

উপন্যাসটিতে লেখক মানুষের ইন্দ্রিয় গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভয়ের সৃষ্টি করেছেন।
” তখন গভীর রাত, হঠাৎ কীসের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মতিয়ারার। তিনি দেখলেন রতন হামাগুড়ি দিয়ে এসে শুয়েছে। আর শোয়ার সাথে সাথে মিষ্টি একটা গন্ধ যেন পুরো ঘরে হামলে পড়ে। রতন তো মতিয়ারার পাশেই শুয়েছিল।গন্ধটা মিষ্টি হলেও তীব্র। মাথা ধরে গিয়েছিল মতিয়ারার। এমন গন্ধের সাথে মতিয়ারা আরও অনেক বছর আগে পরিচিত হয়েছিল।”
পাঠকমনের অজান্তেই একটা মিষ্টি গন্ধ পাঠকও যদি এখানে পেয়ে যান তো সেটা লেখার অলৌকিকতা ছাড়া কিছু নয়।

আবার মানবমনের সরলতা ও মাতৃহৃদয় এর মায়া তুলে এনেছেন লেখায়।
“মতিয়ারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল এই আধখানা দেহটাকে ছুড়ে ফেলবে সে বাড়ির পেছনে বয়ে যাওয়া খালে। তখন মাত্র ফজরের আজান হয়েছে, আর বাড়ির আশেপাশে কেউ ছিলও না। ছোট মাংসপিণ্ডের মতো দেহটাকে নিয়ে ক্লান্ত মতিয়ারা খালের সামনে যখন দাঁড়ায়, তখন বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে। ওই কান্নার ডাক মতিয়ারার কঠিন হৃদয়টাকে মোমের মতো গলিয়ে ফেলে। তখন মতিয়ারা তাকায় বাচ্চাটার দিকে, পিটপিট করে সে তাকানোর চেষ্টা করছে। মতিয়ারার চোখ ভরতি হয়ে পানি আসে সেই চোখ দুটো দেখে। মায়ায় ভরে ওঠে ওর মাতৃমন। যা হবার হবে, সে ঘরে ফিরে আসে। বাচ্চাটাকে বুকের উপরে রেখে উষ্ণতা দেয়। শরীরটা ঠান্ডা বরফের মতো।”

পাঠকের মনে রতনকে ভয়ের প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করলেও মায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে একটা করুণার অবস্থা তৈরি করেছেন। সরল পাঠকমনে তখন রতন চরিত্রটির জন্য করুণার জন্ম হওয়া বেশ স্বাভাবিক।

উপন্যাসটা প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ‌ । উপন্যাসটায় বেশ কিছু গালাগাল আর কিছু যৌনতার বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু গল্পটাকে ভালো ভাবে তুলে ধরতে এগুলো দরকার ছিল বলেই আমার মনে হয়েছে , এই ছোট ছোট জিনিসগুলো গল্পে মগ্ন হতে সাহায্য করবে।

কিছু জায়গায় অল্প কিছু জিনিস ভুল মনে হয়েছে আমার। যেমন : প্রারম্ভে একটা বাক্য ” নিজেকে টিকিয়ে -থাকার- এই লড়াই চলছে সৃষ্টির শুরু থেকে , ”

আবার ১৯ পেজের প্রথম লাইনে রতনের জায়গায় সবুজের নাম লেখা। ” সবুজ অন্যদিনের চেয়ে আজকে দ্রুত ভাত খায়”

বইটার বাঁধাই, প্রচ্ছদ পেজ কোয়ালিটি চমৎকার। এক বসাতে শেষ করে ফেলার মত একটা বই। যদি আপনি রহস্য ও অতিপ্রাকৃত এর ভক্ত হয়ে থাকেন তো বইটি আপনাকে হতাশ করবে না‌, একটি নতুন অভিজ্ঞতা দিয়ে যাবে।

বইয়ের নাম: অদ্ভুত আঁধার এক
লেখক: মনোয়ারুল ইসলাম
ধরণ: অতিপ্রাকৃত
প্রকাশন: নালন্দা
প্রচ্ছদ: ফুয়াদ শেখ
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৫০
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here