Home থ্রিলার বুড়ো নদীটির পায়ের কাছে, যেখানে প্রশ্ন উঠে টেকনোলজির জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য টেকনোলজি?

বুড়ো নদীটির পায়ের কাছে, যেখানে প্রশ্ন উঠে টেকনোলজির জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য টেকনোলজি?

বুড়ো নদীটির পায়ের কাছে, যেখানে প্রশ্ন উঠে টেকনোলজির জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য টেকনোলজি?
বুড়ো নদীটির পায়ের কাছে

‘কর্পোরেট’ শব্দটাতেই একটা ভারিক্কি ব্যাপার আছে। প্রচন্ড গতিশীল এই জীবনের প্রতি আগ্রহেরও কমতি নেই মানুষের। দিনকে দিন আরেকটি বিষয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা সংক্ষেপে AI. বড়ো বড়ো টেক জায়ান্টগুলো প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে কে কার আগে কত নতুন নতুন প্রযুক্তি মানুষের কাছে নিয়ে আসবে। তাদের এই প্রতিযোগিতা কী আসলে সবসময় সুস্থ  থাকছে? নাকি কে কত নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এসে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিবে বিশ্বকে আর সেখান থেকে লুফে নিবে লাখ লাখ ডলার তার আশায় অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা তাদের মাঝেও চলছে?

বুয়েটের সাদাসিধে নাদিম এক দুর্দান্ত জিনিশ আবিষ্কার করেছে। সংক্ষেপে যার নাম TTS (Thought to Speech)। আবিষ্কারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নাদিমের চাই একটা বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম সাথে আরো চাই ফান্ড। কিন্তু কোথায় পাবে? নিজের এই আবিষ্কার নিয়ে কথা বলতে তাই ফিজিক্সের এক অনবদ্য শিক্ষক জামাল নজরুল ইসলামের সাথে দেখা করতে যায় নাদিম। নির্জন বাংলোয় অসাধারণ বেহালা বাজাতে পারা এই মানুষটার একটা সত্য হিস্ট্রি আছে। অসাধারণ এই মানুষটির অস্তিত্ব সত্যি সত্যিই ছিলো এই দেশে। অসম্ভব এই মেধাবী মানুষটি কিন্তু আদতে স্টিফেন হকিং এর বন্ধু মানুষ ছিলেন। দেশের টানে বিদেশের মায়া কাটিয়ে দেশেই ফিরে এসেছিলেন তিনি। সে যাকগে, নাদিমের আবিষ্কারের ব্যাপকতা বুঝতে পারেন তিনি। কথা বলেন স্টিফেন হকিং এর সাথে। সবকিছু যখন ঠিকঠাক চলছিলো, নাদিম যখন তার স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে তখনই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন প্রফেসর জামাল নজরুল। নাদিমের স্বপ্ন থেকে যায় অধরা।

নিজেদের গোপনীয় সোর্সের মাধ্যমে নাদিমের কথা জেনে যায় টেক জায়ান্টগুলো। একটা কোম্পানি নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পৌঁছে যায় নাদিম পর্যন্ত। তার ব্রেইন কাজে লাগাতে চায় তারা। তারা চায় নাদিম তাদের হয়ে কাজটা করুক। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে তাকে নিয়ে আসা হয় আমেরিকায়। আরো নিরাপত্তার সাথে তাকে তার কাজ করার জন্য নিয়ে আসা হয় একটা বাড়িতে। তার দেখভালের জন্য এখানে সব আছে শুধু শর্ত হলো সে কোথাও যেতে পারবে না, কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারবে না, সে শুধু নিজের কাজ করে যাবে। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নাদিম নিজের কাজ করে যায়, মাঝে মাঝে যে তার মন খারাপ হয় না তা না কিন্তু সে নিজেকে ব্যস্ত রাখে তার আবিষ্কারের মাঝে।

পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন নাদিম জানেই না কিভাবে প্রতারিত করে তাকে নিয়ে আসা হয়েছে। করপোরেট দুনিয়ায় তাকে নিয়ে চলছে তুমুল উত্তেজনা। পুরো বইটা জুড়েই টেকনোলজির ব্যবহারের বিষয় বেশ সূক্ষ্ম ভাবেই তুলে ধরেছেন লেখক। করপোরেট দুনিয়ায় কেউ কারো নয় একাহ্নে সবার কাছে যে তাদের স্বার্থটাই আসল এই সত্যটাই আবারো দেখিয়ে দিলেন চোখে আঙুল দিয়ে।

নাদিমের আমেরিকা যাওয়ার পর্ব থেকে বইয়ের একদম শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণটাই অদ্ভুত এক আগ্রহ তৈরি করে যার কারণে বইটা এক বসায় না পড়ে উঠে যাওয়া বেশ কষ্টকর। থ্রিলার বই যেমন প্রতি মুহূর্তেই একটা জানার আগ্রহ তৈরি করে যে এরপর কী হবে লেখক সেই আবহ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন বলেই আমি মনে করি।

করপোরেট এসপিওনাজ, তাদের ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা, তাদের স্বার্থপরতা, নিজেদের কর্মীদেরও যে তারা ছাড় দেয় না এই সবের সাথে যে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে তারা যায় প্রত্যেকটা বিষয়ই এখানে উঠে এসেছে। তবে কিছু দিক দিয়ে তাদের চিন্তা ভাবনা খুব একটা আলাদা নয়। এই যেমন তাদের প্রত্যেকেরই চাওয়া হয় নাদিম তাদের জন্য কাজ করবে নয়তো কারো জন্যেই না। যুগান্তকারী আবিষ্কার দিয়ে পৃথিবীর অনেক মানুষের কষ্ট লাঘব করতে চাওয়া ছেলেটা জানেই না তার আবিষ্কার তার জন্যেই মরণ ফাঁদ তৈরি করতে যাচ্ছে।

তবে এই সব ছাপিয়েও কিছু জিনিশ এখানে উঠে এসেছে। এই যেমন মানুষের প্রতি মানুষের নির্লোভ এবং নির্মোহ ভালোবাসা,  বাবা মেয়ের ভালোবাসা কিংবা কথা দিয়ে কথা রাখার তীব্রতা। এই দিকগুলো উপন্যাসটিতে অন্য এক মাত্রা যোগ করেছে।

নাদিম কি পেরেছিলো তার আবিষ্কারকে পরিপূর্ণতা দিতে? কী হয়েছিল নাদিমের? মায়ের জন্য মন পুড়তে থাকা ছেলেটা ফিরতে পেরেছিল মায়ের কাছে? বাবা মেয়ের ভালোবাসাই বা আসলো কোথা থেকে? কিংবা করপোরেট এসপিওনেজরা কাজ করে কিভাবে? এই সবকিছু জানতে হলে পড়ে ফেলতে হবে বইটি। আর অতি অবশ্যই সময় নিয়ে পড়তে বসতে হবে। কারণ শেষ না করে উঠতে ইচ্ছে করবে না।

বইয়ের নাম: বুড়ো নদীটির পায়ের কাছে
লেখক: বাদল সৈয়দ
ধরণ: থ্রিলার
প্রকাশন: বাতিঘর প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রি
প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৫৯
মুদ্রিত মূল্য: ২৮০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here