যুদ্ধ, সংঘাত, সংগ্রাম। শব্দগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এদের ব্যাপকতা তীব্র। যুদ্ধের সাথে আমাদের বেশ গভীর একটা সম্পর্কও রয়েছে। এই যুদ্ধ হলো বলেই তো আজ মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারছি আমরা। ১৬ই ডিসেম্বর লাল সবুজের পতাকা হাতে শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা বিজয় উদযাপন করি। যুদ্ধ তাহলে খারাপ কিছু তো না। কিন্তু…
হ্যাঁ একটা কিন্তু আছে বটে। যুদ্ধ, আন্দোলন, সংগ্রাম বরাবরই একটা পুরনো প্রথার শেষ ঘটিয়ে উন্মোচন করে এক নতুন অধ্যায়। যারা এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যায়, যারা যুদ্ধে তাদের প্রিয়জন হারায়, যারা যুদ্ধের কারণে হারিয়ে ফেলে নিজেদের প্রিয় মাতৃভূমি তাদের কাছে কেমন এই যুদ্ধ? এই বিভীষিকাময় সময়টুকু কিভাবে পার করেছিলো, করছে আমার, আপনার মতো ছা পোষা মানুষগুলো?
সিরিয়ায় সংঘটিত গৃহযুদ্ধে চারটি সাধারণ পরিবারের কথা নিয়ে লেখা হয়েছে সিরিয়ার গল্পগুলো বইটি। তিউনিশিয়ায় শুরু হওয়া আরব বসন্ত একটু দেরিতে হলেও স্পর্শ করেছিলো সিরিয়াকে। বসন্তের মতো প্রশান্তি না দিয়ে বরং দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ছারখার করেছে অসংখ্য মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ। আর সাধারণ মানুষগুলো তীব্র লড়াই করে এটাই যেন বলছে শ্বাস যতক্ষণ আছে ততক্ষণ লড়াই করে টিকে থাকাটাই আসল, সেটাই সত্য। প্রতিকূলতার মাঝে তাদের এই টিকে থাকার লড়াই তাই আমাদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষ অনুপ্রেরণারও যোগান দেয়।
চারটা পরিবারের কথা লিখতে গিয়ে এখানে উঠে এসেছে যুদ্ধের আগে তাদের জীবন ব্যবস্থা, যুদ্ধের আগে সিরিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা, যুদ্ধের সময়কার অবস্থা, তখন কী ধরণের রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছিলো, সরকারি বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর এলাকা দখল, গোলাগুলির মাঝে বেসামরিক এই পরিবারগুলো কিভাবে টিকে থাকার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে গিয়েছে এই সবকিছু।
বাবা, দাদাসহ চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি সিরিয়াতে থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার পরিবারকে বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হয়েই সিরিয়া ছাড়তে হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তুরস্ক কিংবা মিশরে সেখান থেকে সমুদ্রপথ ধরে গ্রিসে তারপর নানা দেশ হয়ে ইউরোপে গিয়ে থিতু হতে হয়েছে। আর সিরিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার যাত্রাটুকু যে কী ভীষণ ভয়ংকর তা হয়তো স্বপ্নেও কল্পনা করতে চাইবো না আমরা। তারা জানে আর হয়তো কখনো সিরিয়া ফেরা হবে না তাদের, তাও দিন শেষে মনের কোণে একটা চাপা আকুতি, একটা অস্পষ্ট স্বপ্ন যেন থেকেই যায় নিজ মাতৃভূমিতে ফেরার।
প্রতিটা গল্প পড়ার সময় যখনই গল্পে কোনো কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে আমি চলে যেতাম গল্পের শেষের দিকে। আমার মন তখন একটা জিনিসই জানতে চাইতো, আচ্ছা এই পরিবারের সবাই বেঁচে আছে তো। একসাথে আছে তো ওরা। ঘর, বাড়ি, সম্পদ, দেশ সব চলে গেলেও পরিবারের মানুষগুলো যেন থাকে!!!
সবগুলো গল্পই অসম্ভব মন খারাপ করা। আমি মূলত এক বসায় বই পড়ে শেষ করি। এই বই পড়তে কষ্ট হচ্ছিলো। এই পরিবারগুলো যেসব ভয়াবহতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো আমি এক বসায় তা কল্পনাও করতে পারছিলাম না এবং চাচ্ছিলামও না।
গল্পদের বিশদে যাবো না। রাক্কা থেকে পলায়ন, লাতাকিয়ার অপহৃত বোনেরা, ইয়ারমুকের পিয়ানোবাদক, দেরার সাঁতার না জানা তরুণী, চারটি গল্পে যুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে ভালোভাবেই। লেখক প্রতিটি গল্পের আগে যে জায়গাগুলোতে পরিবারগুলো থাকতো ওই এলাকাগুলোর মানচিত্রও জুড়ে দিয়েছেন। এতে ঘটনাগুলো কল্পনা করতে বেশ সুবিধে হচ্ছিলো। যে কটি পরিবার সিরিয়া থেকে স্মাগলারদের সাহায্য নিয়ে অন্য দেশে যাচ্ছিলেন, তাদের যাত্রা কথা এডভেঞ্চারাস হলেও আদতে তা প্রচন্ড রকম অমানবিক এক যাত্রা।। যুদ্ধের আড়ালে ঘটে যাওয়া এসব অমানবিক যাত্রার কথা সবারই জানা উচিত!
চারটি পরিবারের মাঝে ‘দেরার সাঁতার না জানা তরুণী’ দোয়ার গল্প পড়ে সব থেকে বেশি স্তম্ভিত হয়েছি। যুদ্ধ যতটুকু না কাড়লো মেয়েটার থেকে তার থেকেও বেশি কেড়ে নিলো ওই সমুদ্র কিংবা ওই মানুষরূপী হায়েনাগুলো! নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করেছি এও কি সম্ভব! এতটা ক্রূরতা! তাও মানুষ হয়ে! কিংবা কে জানে মানুষ বলেই হয়তো এতটা ক্রূরতা ধারণ করা যায়!
লেখক তার বইয়ের শুরুতে ফিলিস্তিনের বিখ্যাত কবি ‘মাহমুদ দারবিশ’ এর কিছু লাইন লিখেছেন, আমিও সেই লাইনগুলো বলতে চাই,
‘একদিন যুদ্ধ শেষ হবে, নেতারা আবার করমর্দন করবে।
কিন্তু সেই বৃদ্ধ মহিলা তখনো তার শহিদ সন্তানের পথ চেয়ে বসে থাকবে।
সেই তরুণী দিন গুণবে তার প্রিয়তম স্বামীর অপেক্ষায়।
আর সেই শিশুরা বসে থাকবে তাদের বীর বাবার পথ চেয়ে।
আমি জানি না কে আমার দেশ বিক্রি করে দিয়েছে,
কিন্তু আমি জানি কারা এর জন্য মূল্য দিয়েছে!’
এই লেখাটা যখন লিখছি তখনও হাজার হাজার মাইল দূরে কোথাও কেউ অনর্থক কোনো যুদ্ধের আতংকে দিন কাটাচ্ছে। কোনো একটা সাধারণ পরিবারের সব তছনছ হয়ে গেছে, হয়তো এই মাত্রই কেউ হারিয়েছে তার প্রিয়জনকে কিন্তু বেঁচে থাকার লড়াই হয়তো কেড়ে নিয়েছে তার শোক প্রকাশের ক্ষমতা কিংবা অধিকার! আসলেই তো যুদ্ধ একদিন থেমে যাবে। নেতারা স্বাভাবিক ভাবে একই টেবিলে বসে ভবিষ্যৎ এর জন্য পরিকল্পনা কাঠামো দাঁড় করবেন, দেশ চালাবেন। শুধু ইতিহাস সাক্ষী রইলো যুগ যুগ ধরে হয়ে যাওয়া যুদ্ধের মূল্য যারা দিলেন তারা কখনো যুদ্ধ শুরু করেন নি!
লেখকের কথা একটু বলা যাক। লেখকের রাজনৈতিক প্রবন্ধ আমার খুব পছন্দের। মুখবইয়ে পড়া হয়। সেই মুখবই থেকেই এই বই সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমার বাজেটের চেয়ে বেশি দাম হলেও বইটি সংগ্রহ করলাম। যেহেতু লেখকের লেখা আগে পড়া হয়েছে তো স্বাভাবিক আগ্রহ নিয়েই পড়তে শুরু করেছিলাম। শুধু এটুকু বলতে চাই যে লেখকের লেখা আমাকে হতাশ করেনি।
বইয়ের নাম: ্গল্পগুলো সিরিয়ার
লেখক: মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা
ধরণ: গল্প
প্রকাশন: স্বরে অ
প্রচ্ছদ: আদনান আহমেদ রিজন
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩১২
মুদ্রিত মূল্য: ৭৫০