গল্পের বই পড়তে আমি মোটেও ইচ্ছুক ছিলাম না। মনে করতাম একাডেমিক বই পড়েই জীবনের যে দশা হয়েছে তার ওপর আবার গল্পের বই । কিন্তু একদিন আমার এক আপু আমাকে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার এর লেখা কিশোর উপন্যাস ‘আমি তপু’ বইটি দেন।
বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখক তপুর অনুভূতি যেভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেছেন সেটি দেখে বোঝাই যায় এটি একটি সার্থক কিশোর উপন্যাস। বইটি শেষ পর্যন্ত আমাকে বই প্রেমিক করেই ছাড়ল। শুরুতেই আমি জানতে পারি তপুর ভালো নাম আরিফুল ইসলাম। পড়াশোনায় তপু বেশ ভালো ছিল। সে সবসময় ফার্স্ট হতো , এমনকি যে সেকেন্ড হতো তার পরীক্ষার নম্বর এবং তপুর নম্বরের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতো। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা তপুর হাসিমাখা জীবনকে উল্টে দেয়। তপুর বাবা তিন বছর আগে এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন।
এই তিন বছরে তপু মনে করে তার বয়স হয়েছে ত্রিশ বছর। প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরে বুঝতে পারলাম তপুর বলা এই বাক্যটির অর্থ কি। গত তিন বছরে তপুর জীবনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। এখন পরিক্ষায় সে খুব কষ্টে পাস করে , আচার-ব্যবহার সব কিছু খারাপ হয়ে গিয়েছে । এখন তার একটি বন্ধুও নেই। সবাই মনে করে তার বাবা মারা যাওয়ার পর সে বখে গিয়েছে। তবে প্রকৃত সত্য তপু এবং দুলি খালা ব্যতীত আর কেউ জানতো না। তপুর বাবার মৃত্যুর পর তার মা’র মষ্কিক বিকৃতি হয় এবং তিনি বাবা মৃত্যুর সব দোষ তপুর উপর দেন। অতঃপর তপু তার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। তার থাকার নতুন জায়গা হয় স্টোররুমে। স্টোররুমের ছোট্ট একটি ইঁদুর তার বন্ধু হয় যার নাম হয় মিচকি। যখন জীবন হয় কষ্টময় তখন মানুষের মাথায় দুটি চিন্তা আসে। এক. কষ্ট থেকে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়া। দুই. আত্মহত্যা করা। তপুও এ দুটি বিষয় চিন্তা করে শেষে এক নম্বরটি বেছে নেয়।
সব সিদ্ধান্ত নেয়া শেষ। সে ভেবেই রেখেছে বাড়ি থেকে চলে যাওয়াই একমাত্র উপায়। কিন্তু হঠাৎ প্রিয়াংকা নামক হাসিমাখা একটি মেয়ে তপুর জীবনে এসে সব বদলে দেয়। কেবল তপুর জীবন নয়, ক্লাসের নিস্তেজ পরিবেশটিও পরিবর্তন করে দেয়। তপু প্রিয়াংকাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে বলে,”প্রিয়াংকা মেয়েটা অনেকটা ম্যাজিকের মতো। “ প্রিয়াংকা মেয়েটি খুবই আজব। সে নিজেকে খুশি করার থেকে অন্যকে খুশি করার মাঝে অনেক বেশি আনন্দ পায়। প্রিয়াংকা সম্পর্কে জেনে আমি সত্যিই ভাবতে লাগলাম, “ইস! আমিও যদি প্রিয়াংকার মতো হতে পারতাম”। প্রিয়াংকা-ই তপুকে তার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে এবং গণিত বিষয়ে তার লুকায়িত প্রতিভাকে তার সামনে তুলে ধরে। যার ফলস্বরূপ তপু গণিত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নদের চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর থেকে তপুর জীবন আর আগের মতো রইল না।
প্রিয়াংকা ছাড়াও এই উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র যেমনঃ প্রিন্সিপাল ম্যাডাম, দুলি খালা, প্রিয়াংকার বাবা, বন্ধু-বান্ধবদের চরিত্রও আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। মষ্কিক বিকৃতির কারণে তপুর মা তপুকে অনেক অত্যাচার করেছিল । কিন্তু হঠাৎ তপু চিরদিনের জন্য এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পেল। সৃষ্টিকর্তার কাছে এই অত্যাচার থেকে মুক্তি না পাওয়ার জন্য অনেক আকুতি-মিনতি করেও লাভ হলো না। মায়ের বুকে মাথা রেখে মাকে চিরদিনের জন্য বিদায় দিল তপু। ব্যক্তিগতভাবে বইটি আমার মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
বইয়ের নাম: আমি তপু
লেখক: মুহম্মদ জাফর ইকবাল
ধরণ: কিশোর উপন্যাস
প্রকাশন: পার্ল পাবলিকেশন্স
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রথম প্রকাশ: ২০০৫
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১২৩
মুদ্রিত মূল্য: ১৫০