এই বইটা আমার হাতে এসেছে এক ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে।বইটা পাওয়ার পর বইটার নাম বা লেখক কোনটাই আমাকে ঠিক আকর্ষন করে নি।এটা আমারই দুর্ভাগ্য যে নতুন পাঠক হিসেবে সৈয়দ মুজতবা আলীর সম্পর্কে কোন ধারনাই আমার ছিল না।আর তারপর যা হবার তাই,বইটা দীর্ঘকাল আমার টেবিলেই পড়ে থাকলো।একসময় পড়ার মত আর বই খুঁজে না পেয়ে বইটা পড়লাম।তখন আবার আফসোস হওয়া শুরু করলো এত ভালো একটা বই কিনা আমি এতদিন ফেলে রাখলাম!
এবার আসি লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর ব্যাপারে।লেখক পরিচিতি পড়ে জানতে পারলাম তিনি এক বিরাট গুণী ব্যাক্তি। সিলেটের করিমগঞ্জে ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ওনার জন্ম।শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতক ১৯২৬ এ।পরবর্তীতে আফগানিস্তানের কাবুলের শিক্ষাদপ্তরে ফরাসি ও ইংরেজী ভাষার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেওয়ার দুই বছর পরে স্কলারশিপ নিয়ে যান জার্মানের বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে।মূলত জার্মানির বার্লিনের পটভূমিতেই তিনি এই “চাচা কাহিনী” বইটি লিখেছেন।তিনি যে দক্ষতার সাথে গল্পগুলোয় হাস্যরস উপস্থাপন করেছেন তার যতই প্রশংসা করা হোক না কেন তা যথেষ্ট নয়।আরেকট মজার তথ্য হলো,সৈয়দ মুজতবা আলী ছিলেন একজন বহুভাষাবিদ।ফরাসি,জার্মানি,ইটালিয়ান,আরবী,ফারসি,উর্দু,হিন্দি,সংসংস্কৃত,গুজরাটি,মারাঠি সহ মোট পনেরটি ভাষা জানতেন তিনি।১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ এ চিরতরে বিদায় নেন এই গুণী লেখক।
“চাচা কাহিনী” বইটি আমার অন্যতম পছন্দের একটা বই হওয়ার কারন চমৎকার লেখনী আর আর বিদেশি সংস্কৃতির অসামান্য উপস্থাপন।আপনি যদি একজন বইপ্রেমী হোন তাহলে এই বইটি আপনাকে মোটেই বিরক্ত হওয়ার সুযোগ দেবে না।বইটিতে মোট ১১ টি ছোটগল্প আছে।গল্পগুলো হলো যথাক্রমে-
“স্বয়ংবরা” -এই গল্পের শুরুর দিকে মুলত একে একে প্রধান চরিত্রগুলো তথা চাচা,শ্রীধর,মুখুয্যে,পুলিন সরকার,সূর্য রায়,গোলাম মৌলা,গোঁসাই নামক চরিত্রগুলোর পরিচয় তুলে ধরেছেন।তবে গল্পটা যতই এগিয়েছে ততই চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছে। এই গল্প থেকে আমার পছন্দের কয়েকটি লাইন হলো-
“জর্মনি শুয়ারের দেশ,অর্থাৎ জর্মনির প্রধান খাদ্য শূকর-মাংস।”
“হক কথা কয়েছ সরকার।সবই বিক্রি,সব বেচে ফেলতে হয়।খাই তো দু-ফোঁটা বিয়ার কিন্তু বিক্রি করে দিতে হয়েছে বেবাক লিভারখানা।”
“কর্নেল”-এই গল্প টা চাচার এক জার্মান বাড়িতে পেয়িং গেস্ট থাকার অভিজ্ঞতার গল্প।গল্পটার মাঝে অনেক কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করেছেন লেখক যার বেশিরভাগই আমার মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে।অবশ্য এটা আমারই অজ্ঞতা,নাহয় আরো বেশি উপভোগ্য হতো।তবে শেষটায় বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলাম।গল্প থেকে পছন্দের লাইন-
” মশলা না দিলে আমাদের ঝোল হয়ে যায় আইরিশ স্টু,ডাল হয় লেন্টিল সুপ,তরকারি হয় বয়েল্ড ভেজ,মাছভাজা হয় ফ্রাইড ফিশ।”
“মা জননী”-ঘটনাক্রমে এক যক্ষারোগীর দেখাশোনা করার চাকরী পান চাচা।সেই সময়কার সেই রোগীরে দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত এক নার্স এবং তার মাতৃত্ব নিয়েই গল্প।এই বইয়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক আর আবেগময় গল্প ছিলো এটি।একটু পরপরই চোখটা ভিজে উঠছিলো।১১ টা গল্পের মধ্যে একটা বাছাই করতে হলে আমি এটাই বাছাই করবো।গল্পটি থেকে পছন্দের কিছু লাইন-
” দেশে আমার বোন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে বাড়ি ফিরেছে।মা খুশি,বাবা খুশি।দুদিন আগে নির্মমভাবে যে বোনের চুল ছিঁড়েছি তার জন্যে তখন কাঁচআ পেয়ারার সন্ধানে সারা দুপুর পাড়া চষি।তার শরীরের বিশেষ যত্ন নেওয়ার কথা উঠলে,সে মিষ্টি হাসে-কী রকম লজ্জা,খুশি আর গর্বে মেশানো।ছোটবোনরা কাঁথা সেলাই করে,আর বাবার বুড়ো বন্ধু কবরেজ মশায় দু’বেলা গলাখাঁকারি দিয়ে বাড়িতে ঢোকেন।
তীর্থহীনা-গল্পে ঢুকতে বেশ সময় লেগেছে।বেশ কঠিন কঠিন কথাও আছে গল্পটায়।তবে শেষটা সত্যিই দুঃখজনক।স্যাড এন্ডিং!গল্পের থেকে পছন্দের কয়েকটি লাইন-
“সবচেয়ে মুগ্ধ হলাম মোকামে পৌঁছে,ট্রাম থেকে নেমে সেখানে রাইনের দিকে তাকিয়ে দেখি রাইনের বুকের উপর ফুটে উঠেছে দুটি ছোট ছোট পল্লব ঘন দ্বীপ।তার পেলব সৌন্দর্য আমার মনে যে তুলনাটি এনে দিল,নিতান্ত বেরসিকের মনেও সেই তুলনাটাই আসত।তাই সেটা আর বলছি না।”
“বেলতলাতে দু-দুবার”-মিউনিখে এক মুদির দোকানীর বাড়িতে তার পরিবারের সাথে থাকাকালীন সেই পরিবারের বড় ছেলের সাথে চাচার বন্ধুত্ব নিয়েই এগিয়েছে গল্প।আগাগোড়া পুরোটাই উপভোগ্য ছিল।বিশেষ করে শেষাংশটা হাস্যরসে পরিপূর্ন ছিল।গল্প থেকে পছন্দের লাইন-
” বান্ধব বর্জন সবসময়ই পীড়াদায়ক-সে বর্জন কারো ইচ্ছায় আর অনিচ্ছায়ই ঘটুক।”
“কাফে-দে-জেনি”-দৈর্ঘের বিচারে বইয়ের সবচেয়ে ছোট গল্প।খুব আহামরি কিছু না হলেও ভালো ছিল এটাও।
পছন্দের লাইন-
” যারা সকল্পন বাক্যের পূর্বার্ধ বলে উত্তরার্ধ নির্নয় করে না,তারা ভাষার কোমর কাটে।মানুষের গলা কাটতে তাদের কতক্ষণ?”
“বিধবা বিবাহ”-সয়াজি রাওয়ের চিড়িয়াখানায় হাবশি রাজার উপঢৌকন হিসেবে নতুন সংযোজন হলো একজোড়া সিংহ।তারপর?বাকিটুকু জানতে পড়তে হবে গল্পটি।পছন্দের লাইন-
” বাইরের জানোয়ারগুলোর জ্বালায় অস্থির হলে আমি হামেশাই চিড়িয়াখানায় যাই।খুদখেয়ালি অর্থাৎ আত্মচিন্তার জন্য জায়গাটি খুব ভালো।”
“রাক্ষসী”-ঘটনাক্রমে এক বৃদ্ধের সাথে পরিচয় হয় লেখকে।বৃদ্ধ জানায় সে মদ খুব একটা খায় না শুধু বৃষ্টি নামলেই মদ খেতে হয়।এমন অদ্ভুত যুক্তির ব্যাখ্যা জানতে গিয়ে উঠে আসে এক রহস্যজনক গল্প।বেশ ভালোই সাস্পেন্স ছিল।মজার ব্যাপার হলো গল্পটা এমন জায়গায় গিয়ে শেষ হবে যে আপনি বুঝতেই পারবেন না হাসবেন নাকি ব্যাথিত হবেন।এই বই থেকে আমার দ্বিতীয় পছন্দ।পছন্দের লাইন-
” মদ খেলে কেউ হয়ে যায় ঝগড়াটে,কেউ-বা আরম্ভ করে বদ রসিকতা,কেউ করে খিস্তি,কেউ হয়ে যায় যিশু খ্রিষ্ট-দুনিয়ার তাবৎ দুঃখকষ্ট সে তখন আপন স্কন্ধে তুলে নিতে চায়,আর সবাইকে টাকা ধার দেয়।”
“পাদটীকা”-লেখকের ছেলেবেলার সংস্কৃতের পন্ডিতমশাইয়ের স্মৃতিচারন করেছেন এই গল্পে।ইংরেজদের আমলে তারা সম্মান আর আর্থিকভাবে কতটা অবহেলিত ছিল তা অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পে।একবার তো এও উল্লেখ করেছেন যে কোন কোন পন্ডিতমশাইয়ের বেতন নাকি স্কুলের চাপরাসির থেকেও কম ছিল।মন খারাপ করে দেওয়া একটা গল্প।পছন্দের লাইন-
” ‘Silence is golden’ মূর্খ বলেছে তাকে যেন মরার পূর্বে একবার একলা একলি পাই।”
“পুনশ্চ”-পকেটে পয়সা নেই যথেষ্ট কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে কোন সুন্দরীর সাথে ডেটে যেতে হলে অবস্থাটা কিরকম দাঁড়ায়?নিশ্চয়ই বিদঘুটে আর বিব্রতকর।এরকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই শুরু হয় গল্প।পরবর্তীতে অবশ্য রোম্যান্টিসিজমে মোড় নেয় গল্প।পছন্দের লাইন-
” ইতর ব্যাপারে ‘যাহা অল্প তাহাই মিষ্ট’ হতে পারে,কিন্তু ভদ্রতার ব্যাপারে আধিক্যে দোষ নেই।”
“বেঁচে থাকো সর্দিকাশি”-বইয়ের শেষ গল্প।আরেকটা রোমান্টিক গল্প।তবে এবারে হ্যাপি এন্ডিং,যা বইটা শেষ করার পরে একটা আত্মতৃপ্তি এনে দেবে।পছন্দের লাইন-
” ওষুধ খেলে সর্দি সারে সাত দিনে,না খেলে এক সপ্তায়”।

বইয়ের নাম: চাচা কাহিনী
লেখক: সৈয়দ মুজতবা আলী
ধরণ: গল্প
প্রকাশন: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৪
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১২৩
মুদ্রিত মূল্য: ২০০