Home গল্প মামলার সাক্ষী ময়না পাখি : এক স্বতন্ত্র গল্পভুবন

মামলার সাক্ষী ময়না পাখি : এক স্বতন্ত্র গল্পভুবন

0
মামলার সাক্ষী ময়না পাখি : এক স্বতন্ত্র গল্পভুবন
মামলার স্বাক্ষী ময়না পাখি : শাহাদুজ্জামান

এগারোটি গল্প নিয়ে গঠিত পাঠকপ্রিয় লেখক শাহাদুজ্জামানের গল্পগ্রন্থ ‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখি’ যা ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪২৫’ পুরস্কারপ্রাপ্ত। বইটির এগারোটি গল্পেই রয়েছে ভিন্ন স্বাদ।  গল্পগুলোর লেখনশৈলীই পাঠককে সবচে বেশি আকৃষ্ট করে রাখবে। বুঁদ হয়ে থাকতে হবে লেখকের তৈরি করা স্বতন্ত্র গল্পভুবনে।

বইয়ের গল্পগুলোর কাহিনীবিবর্জিত পর্যালোচনা—

জনৈক স্তন্যপায়ী প্রাণী, যিনি গল্প লেখেন (গল্প-১)

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে মনুষ্য প্রজাতির কতিপয় ব্যক্তি অবাস্তব জগতে বসবাস করে সারাটা জনমভর। তারা গল্প লেখে। মতিন কায়সার তেমনই গল্প লেখার খেলায় মত্ত একজন লেখক যিনি রকম-ধরন নির্বিশেষে শুধু একটা ‘হয়ে ওঠা গল্প’ লিখতে চায়। তার এই চাওয়াকে কেন্দ্র করেই এই গল্পটি। যেই গল্পের মধ্যে গল্প কম দর্শন বেশি। এই গল্পের সবচেয়ে উপজীব্য বিষয়টি হচ্ছে শাহাদুজ্জামানের অসাধারণ লেখনশৈলী। তিনি নামমাত্র গল্পে লিখে গেছেন মতিন কায়সারের পক্ষ থেকে নানান সুখবোধ্য কিংবা দুর্বোধ্য কথা, হয় তো পরস্পর সাংঘর্ষিক দর্শন বা কখনো মেটাফর।

অতঃপর, সেই হয়ে ওঠা গল্পের জন্য আরেকটা গল্প। সেই গল্প শেষ হতে-হতে মূল গল্পও শেষ।  যেখানে মতিন কায়সার একটা উপলক্ষ্য মাত্র, যার মধ্যমে লেখক টানলেন একটা চমৎকার পরিসমাপ্তি। বারবার পড়তে ইচ্ছে করবে শেষটুকু। ডুবে থাকতে ইচ্ছে করবে লেখকের দর্শনে।

মৃত্যু সম্পর্কে আমার অবস্থান খুব পরিষ্কার (গল্প-২)

জনৈক এক ব্যাক্তি আমাদের সাথে কথা বলে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে আইসিউর তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তারের সাথেও কথা বলছেন। তার বৃদ্ধ পিতা মারা যাচ্ছেন। তাকে বাঁচিয়ে রাখা বিষয়ক কথাবার্তা চলছে। আর আমাদের সাথে করে যাচ্ছেন পিতৃ-বিষয়ক রোমন্থন।

ধীরে ধীরে আমাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি দাঁড়াবেন জীবন-মৃত্যুর ঠিক মাঝামাঝি থাকা একটি সিদ্ধান্তে, নৈতিকতা ও অনৈতিকতার তুমুল দ্বন্দ্বে। টিথোনাসের অমরত্ব কি মধুর? মৃত্যু সম্পর্কে তার অবস্থান খুব পরিষ্কার, তিনি এর ঘোর বিরোধী।

টুকরো রোদের মতো খাম (গল্প-৩)

আন্দালীব, যার মাথায় খেয়াল পোকার বাস, বসে আছেন একটা অচেনা-লোকের-লেখা চিঠি নিয়ে। যে চিঠির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সেই চিঠি খুলে তিনি আবিষ্কার করবেন ধূসর পৃথিবীর কোনাকাঞ্চিতে কত গল্প বিলীন হয়ে যায় ধুলোয় চাপা পড়ে। আন্দালীব তেমনই এক গল্পকে কিছুটা পূর্ণতা দিবেন বা দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

চিন্তাশীল প্রবীণ বানর (গল্প-৪)

❝চান্দের আলো হালায় মাইয়ার শরীলে ঢুইকা আর বাইরাবার পারতাছে না।❞

পুরান ঢাকার আদিবাসী খয়রি রঙা এক বৃদ্ধ বানর সর্বক্ষণ নিবিড় পর্ববেক্ষণ করে আবদুল মোমেনের ছোটো পরিবারটিকে। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে জানা গেলো এক আচানক তথ্য! তবে চিন্তাশীল প্রবীণ বানরের কোনো ভাবলেশ নেই। তার চোখে লেখক বলেছেন এক লৌকিক গল্প।

পৃথিবীতে হয়তো বৃহস্পতিবার (গল্প-৫)

❝প্রতারণার দক্ষতাই এই শহরে টিকে থাকার মন্ত্র❞

কর্পোরেট অফিসের জব করা মাসুদের গল্পটার মতো ঘটনা আমাদের সাথে ঘটে, প্রায়ই ঘটে। মনে হবে গল্পটা যেন আমাদেরই। খুব ভাবাবে পাঠককে, মাসুদের অনুভূতির সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারবেন পাঠক।

উবার (গল্প-৬)

আমরা যা ভাবি, যা দেখি, যাকে যেমন করে মনে করি আদতে সে বা তার গল্পটা কি তেমনই?

অপস্রিয়মাণ তির (গল্প-৭)

ইহা একটি পার্ফেক্ট ছোটোগল্প। অতি চমৎকার এগারোটা গল্পের মধ্যে যেকটা প্রচণ্ড ভালো লেগেছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। গল্পটা সম্পর্কে আমি কিচ্ছু বলব না। বললেই যেন সব বলা হয়ে যাবে মনে হচ্ছে। শুধু এটুকুই বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’-এর উপযুক্ত উদাহরণ এটি। ছোটোগল্পের ব্যাকরণ মেনে লেখক যে গভীর জীবনবোধ ও দর্শন আমাদের বলবেন এখানে, তা আপনাকে ভাবাতে বাধ্য করবে।

ওয়ানওয়ে টিকিট (গল্প-৮)

দেশত্যাগ নিয়ে যে মিথ রয়েছে দেশে, ঠিক তার উল্টোদিকে থাকা রফিকুল আলম আজ দেশ ত্যাগের সংকল্পে অটুট। পরস্পর সাংঘর্ষিক যুক্তির জলোচ্ছ্বাস চলছে তার মাথায়। কিন্তু কেন তিনি তারই লালিত বিশ্বাসের বিপরীতে গিয়ে আজ অপ্রিয় গন্তব্যের দিকে, তা নিয়েই এই গল্পের আবহ।

লবঙ্গের বঙ্গ ফেলে (গল্প-৯)

আমাদের সমাজে দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে যে অস্বস্তি বা মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান সে বিষয়টিকে টার্গেট করেই গল্পের প্লট। এক প্রবীণ ব্যক্তির দ্বিতীয় বিবাহ পরবর্তী মেয়ে-জামাইয়ের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন আর নতুন স্ত্রীর চঞ্চলতা নিয়েই গল্পটা এগোতে থাকলেও শেষ ভাগে গল্প মোড় নিয়ে এমন কোথাও ঠেকবে যে পাঠক বিস্মৃত হয়ে এক অনাকাঙ্খিত পরিণতিতে আবদ্ধ হবে।

☞ মামলার সাক্ষী ময়না পাখি (গল্প-১০)

রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ও নিশানদিয়া গ্রামের গাছি মোহাম্মদ বজলুকে কেন্দ্র করে কাহিনী গল্পটির। আর এই গল্পের নামেই বইটির নাম। তো এখানে ‘মামলার স্বাক্ষী ময়না পাখি’-তত্ত্বটি আসলোই বা কোথা থেকে? কৌতূহলটা যদি এখানে হয়ে থাকে তবে সে কৌতূহল মিটিয়ে ফেলা উচিৎ। আবদুল করিম খানের একটি একই নামের পুঁথি থেকে নামটি নেওয়া হয়েছে। গল্পটির নামটি একটি মেটাফর মাত্র। গল্পটি আমাদের বলবে—

❝মানুষ অবিরাম সূতোর ওপর দিয়ে হাঁটে—যার একদিকে থাকে সত্য, অন্যদিকে মিথ্যা…পরিস্থিতি মোতাবেক সত্য নির্মাণ করা প্রতিভাবানদেরই কাজ।❞

নাজুক মানুষের সংলাপ (গল্প-১১)

দুজন মানুষের কথোপকথনই এই গল্পের প্রাণ। সংলাপ চলছে প্রবীণ ও অর্বাচিনের মধ্যে। প্রবীণ তার প্রজ্ঞার দ্বারা উপলব্ধ জগতের রূপ-বৈচিত্র্য-সত্য সম্পর্কে বলে যাচ্ছেন অজ্ঞ অর্বাচিনকে। কিন্তু দিনশেষে মানুষ ভীষণ নাজুক…

সংলাপনির্ভর এই গল্পকে ঠিক গল্প বলা যায় কী না জানি না। কিন্তু পাঠককে লেখার ঘোরে ডুবিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট রশদ রয়েছে ইহাতে। লেখক যেন বইয়ের পাতায় পাতায় মিশিয়ে দিয়েছেন অচেনা কোনো মাদক। প্রথম গল্পটির মতোই এই শেষ গল্পটি লেখকের লেখনশৈলীকে আবারও পাঠকের কাছে ভাস্বর করে তুলে পরিশেষে বইটির সমাপ্তি ঘোষণা দেয়।

বইয়ের নাম: মামলার সাক্ষী ময়না পাখি
লেখক: শাহাদুজ্জামান
ধরণ: গল্প
প্রকাশন: প্রথমা প্রকাশন
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৯
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১২
মুদ্রিত মূল্য: ২৪০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here