মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা “মা” উপন্যাসটি নিছক কোনো উপন্যাস নয়, বরং এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি লেখকের প্রখর কল্পনাশক্তির বহিঃপ্রকাশ ও নয় বরং এটি বাস্তব কাহিনীকে কেন্দ্র করে লেখা। ইতিহাসকে আশ্রিত করে লেখা “মা” উপন্যাসটি যেন ইতিহাসেরই পুনর্গঠন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ইউনুস চৌধুরী ও সাফিয়া বেগমের একমাত্র ছেলে আজাদকে কেন্দ্র করেই মূলত বইয়ের কাহিনী বিন্যাস। চৌধুরীর তৈরী কৃত্রিম নরক থেকে দৃঢ়তার সহিত প্রবল ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন আজাদের মা আজাদকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে আসা থেকেই মূলত মূল টুইস্ট শুরু। দৃঢ়চেতা আজাদের মা কখনো উচ্চবিত্ত, কখনো মধ্যবিত্ত আবার কখনো বা নিম্নবিত্তের মতো জীবন পরিচালনা করলেও তার অনুমতি ছাড়া ২য় বিয়ে করা চৌধুরীর কাছে কখনো ফেরত যাননি। নিজের মতো করেই ছেলেকে লেখাপড়া করে মানুষ করেন। শুধু মায়ের দিকে তাকিয়েই আজাদও বিশেষ কিছু বলতে পারেনি।
করাচিতে লেখাপড়া করা আজাদ ঢাকায় ফেরত এসে দেশের নাজেহাল পরিস্থিতিতে দেখে দেশ মাতৃকার টানে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তার বন্ধু রুমি, কাজী কামাল, বদি ভাই সহ সবাই একসাথে ঢাকায় গেরিলা যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের নাস্তানাবুদ করার সময়ে কোনো একদিন সবাইকে একসাথে পাকিস্তানিরা গ্রেফতার করে হাজতে নিয়ে যায়। অনেক টর্চার করার পরেও আজাদ তাদেরকে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকার করে। মায়ের কাছে এবিষয়ে পরামর্শ চাইলে মা সাফিয়া বেগম তাকে শক্ত করে থাকতে বলেন যেন কষ্টের অনুভূতি কম হয় এবং আজাদ যেন কোনো তথ্য না দেয়।এরপরেই জেল হাজত থেকে আজাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়না। সবাই ধরে নেয় সেদিন ৩০শে আগস্ট-ই আজাদকে হানাদাররা হত্যা করে, তবুও তার মা আজাদের অপেক্ষায় দীর্ঘ ১৪ বছর অপেক্ষা করে তিনিও ১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট মারা যান।
“মা” উপন্যাসে যেমন আজাদের মায়ের দৃঢ়তার পরিচয় তুলে ধরে তেমনি ফুটে উঠেছে আজাদও তার সংযোদ্ধাদেরও দেশপ্রেম। একজন মা ঠিক কতটুকু ত্যাগী হলে তার বেঁচে থাকার সম্বল একমাত্র ছেলেকে দেশের জন্য কোরবান করতে পারেন? তরুণ যুবকদের দেশপ্রেম ঠিক কতটুকু বেশি হলে তারা জীবন-যৌবনকে অবহেলা করে মৃত্যকে বেছে নেন?
উপন্যাস বর্ণায় লেখক যথেষ্ট সরলতার পথ ধরেছেন। কিছু বিষয় আলাদা করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে যেমন এক জায়গায় লেখা আছে “মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই এখনে মনে করতে পারে, মেজর জিয়ার কন্ঠস্বর তাদের অনুপ্রাণিত করেছিল খুবই, কারণ তারা আর্মি খুঁজছিল, বাঙালি আর্মি বিদ্রোহ করেছে শুনে তারা বুঝতে পেরেছিল যুদ্ধ সত্যিই শুরু হয়ে গেছে”এটি যুদ্ধের সময়ে সামরিক বাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তাদের ত্যাগের একটি ছোট্ট উপমা হতে পারে।
আরেক জায়গায় দেখতে পাই “মেজর খালেদ মোশাররফ : স্বাধীন দেশের সরকার জীবিত গেরিলাদের চায় না। নো গভর্নমেন্ট ওয়ান্টস আ্যান অ্যালাইভ গেরিলা, নিতে পারেনা। দেশ স্বাধীন হলে তোমাদের কি হবে আমি বলতে পারিনা” শুনতে কটু শুনালেও এটাই বাস্তব। মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বা পরাদীন দুই দেশেই তাদের অন্ধকার ভবিষ্যত জেনেও যেভাবে লড়ে গেছেন তা সত্যিই অভাবনীয়।বইয়ের শেষাংশটাও আমার কাছে অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। এটা পড়ে আমার সপ্তম শ্রেণিতে পড়া আদুভাই গল্পের কথা মনে পড়ে যায় এটার সাথে আদু ভাই গল্পের শেষাংশের প্রচন্ডরকম মিল রয়েছে, যেখানে আদু ভাইয়ের কবরের প্রস্তরে সুন্দর করে তার ইচ্ছানুযায়ী লেখা ছিল, “Here lies Adu Miah who was passed to class 8 from 7” একই ভাবে লেখক বইয়ে তুলে ধরেছেন,
“আজও যদি কেউ যায় জুরাউন গোরস্থানে, দেখতে পাবে কবরটা, আর দেখতে পাবে প্রস্তরফলকে উৎকীর্ণ মায়ের পরিচয় : মোসাম্মৎ সাফিয়া বেগম, শহীদ আজাদের মা।”
একজন শহীদের মা হিসেবে সাফিয়া বেগমের এমন কাজ সত্যিই প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক মাত্রকেই আবেগপ্রবণ করতে যথেষ্ট।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়া গল্প, উপন্যাস না ডকুমেন্টারিতে আমরা সাধারণত দেখতে পাই, স্বাধীনতা ঘোষণার পরে যু্দ্ধ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার আগেই মূলত ঢাকায় গেরিলা হামলা শুরু হয়ে, ফলস্বরূপ সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ মানুষরা আরো উৎসাহী হয়ে অনুপ্রেরণা নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। এ থেকেই ঢাকার আজাদদের মতো গেরিলা যুদ্ধাদের সাহসিকতা ও অবদান একটু হলেও অনুধাবন করা যায়।
লেখক আনিসুল হকের কালজয়ী উপন্যাস “মা” প্রতিটি বাঙালির মনকে অল্প হলেও নাড়া দিয়ে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম বাড়িয়ে দেশের জন্য আজাদদের মতো কিছু করতে উৎসাহিত করবে বলে মনে করি। ফিকশন প্রেমীদের পছন্দের তালিকায় বইটি প্রথমদিকে থাকবে বলে বিশ্বাস করি।
বইয়ের নাম: মা
লেখক: আনিসুল হক
ধরণ: উপন্যাস
প্রকাশন: সময় প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: ২০২০ (৯৯তম মুদ্রণ)
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩১৭
মুদ্রিত মূল্য: ৪৪০