মনে করুন, আপনি নতুন, চকচকে স্যুট-টাই পড়ে রাস্তায় হাঁটছেন। হঠাৎ এক লোক লাঠিসোটা, লোকজন নিয়ে আপনাকে বাধা দিয়ে বলল, “দিন আমার ১০,০০০ টাকা!” আপনি বললেন, “কেন?” লোকটা বলল, “বা’ড়ে! আপনি তো কত সেজেগুজে নামলেন আর আপনাকে মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকলাম, আর কখন যে চোর এসে আমার দোকান থেকে ১০,০০০ টাকা চুরি করে পালিয়েছে তা টেরই পেলাম না! সব দোষ তো আপনার! দিন আমার ১০,০০০ টাকা, নইলে কিন্তু হাত-পা ভেঙে দেব!”
আপনি মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝলেন না, কিন্তু মার খাবার ভয়ে টাকা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর আরেক লোক আপনাকে বাধা দিয়ে বলল যে আপনাকে দেখতে গিয়ে নাকি তার মোবাইল ফোন হাত থেকে পানিতে পরে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তার খরচ ১৫,০০০ টাকা দিতে হবে। ঝামেলা এড়াতে আপনি আবার টাকা মিটিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। এভাবে কিছুক্ষণ পর পর আপনি কারো ঘরে আগুন লেগে যাওয়ার, কারো পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার, কারো কাজের ব্যাঘাত ঘটার, ইত্যাদি সব ঘটনার দোষী সাব্যস্ত হয়ে খেসারত দিচ্ছেন। শেষমেশ এক নাপিত এসে বলল, “আপনাকে দেখতে গিয়ে একজনের দাঁড়ির বদলে তার গলা কেটে ফেলেছি! এর দোষ আপনার, আপনিই খুনি!”
পুলিশ এলো আপনাকে গ্রেফতার করতে। রাগে-দুঃখে আপনি নিজের স্যুট-টাই ছিড়ে ফেলে দিলেন। ঠিক তখনই আপনার খেয়াল হলো যে আপনি আসলে স্বপ্ন দেখছেন। তাই আপনি হাসতে হাসতে আবার সেই ছেড়া স্যুট পড়ে স্বপ্ন শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলেন।
এই গাজাখুরি গল্পের জন্য আপনি আমাকে গালি দিতেই পারেন। তবে এরকম গাজাখুরি গল্পই যে কতটা বাস্তবিক, লেখক আহমদ ছফা তার “গাভী বিত্তান্ত” বইটিতে তা দেখিয়ে দিয়েছেন।
“গাভী বিত্তান্ত” নামটি শুনলে স্বাভাবিক ভাবেই মনে হবে একটি আদর্শ খামারে কোনো গাই গরুর খানাপিনা, সেবা-যত্ন, সব ধরণের পরিচর্যার বর্ণনা করেছেন লেখক। কিন্তু আসলে তা নয়, গল্পটি বাংলাদেশের স্বনামধন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের, সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের, আর পুরো সমাজের।
কোনো নাম উল্লেখ না করলেও, “আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বিশ্ববিদ্যালয়……. ” লাইনটি দ্বারা সহজেই চিহ্নিত করা যায় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, আব্দুল মান্নানের গর্ভবতী গাভী ছাত্রদের গোলাগুলিতে নিহত হয়। এই সত্য ঘটনাকে উপজীব্য ধরেই ১৯৯৫ সালে আহমদ ছফা তার এই বিখ্যাত বইটি লিখেছেন।
গল্পের প্রেক্ষাপট হলো এই যে,
জৈবরসায়নের সাধারণ শান্তশিষ্ট এক শিক্ষক, মিয়া মুহাম্মদ আবু জুনায়েদ, হঠাৎ করেই কোনো এক আশ্চর্য ভাগ্যগুণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। উপাচার্য হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই আবু জুনায়েদ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে শুরু করলেন। ঘরে-বাইরে রোজ রোজকার ঝামেলার মাঝে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন তিনি। তখন পরিচিত একজনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে আসল ‘তরণী’ নামের এক গাভী। উপাচার্য ভবনের পিছনে গড়ে উঠল তার বাস। তরণীর কাছে এসেই যেন আবু জুনায়েদ প্রতিদিনের পেরেশানি থেকে বাচতে পারত, শান্তির নিশ্বাস নিতে পারত। আবু জুনায়েদ, তার পরিবার, তরণী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেখানকার মানুষজনদের দ্বিমুখী আচরণের মাধ্যমে লেখক পুরো সমাজকে ব্যাঙ্গ করেছেন এই বইটিতে।
প্রকাশের ২৬ বছর পরেও বইটিকে এখনও সময়োপযোগী। কেন?
প্রথমত, মিয়া মুহাম্মদ আবু জুনায়েদ চরিত্রটির জন্য। একজন অতি সাধারণ মানুষ তিনি। আপনার, আমার মতো এক সত্তা। কারো সাতে-পাচে নেই। শিক্ষার প্রলেপে, মানবিক গুনাবলী দিয়ে এবং ভাগ্যের জোরে সুযোগ পায় সেই সত্তা। কিন্তু গোড়ামি, লোভ, মানুষজন, পরিবেশ তাকে বাধা হয়ে দাড়ায় বিভিন্ন ভাবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজের অনুন্নতি। এই সমাজ এখনও স্বার্থপর, এখনও কুসংস্কারাচ্ছন্ন, এখন যুক্তিবোধহীন। প্রযুক্তির ব্যবহারে আধুনিকতা শুধু আমাদের সমাজের বাহ্যিক রূপই পাল্টেছে। ২৬ বছর আগে মানুষ, তাদের চিন্তা-ভাবনা, কার্যকলাপ কোনো কিছুর সাথেই আজকের তেমন পার্থক্য নেই।
“গাভী বিত্তান্ত” আমার পড়া আহমদ ছফার প্রথম বই। এই একটা বই পড়েই বুঝে গেছি কেন তিনি বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি। মিয়া মুহাম্মদ আবু জুনায়েদ চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক আহমদ ছফা যেভাবে সেসময়কার আর্থ-সামাজিক, পারিবারিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশকে হাস্যরস ও ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা আসলেই অসাধারণ। এতো সুন্দর একটি বই উপহার দিয়েছেন তিনি, কিন্তু সমাজ এখনও যেন গোঁড়ামিতে সংকল্পবদ্ধ। যেন এই সমাজের সেই গাজাখুরি, যুক্তিহীন স্বপ্ন এখনও ভাঙছে না।
বইয়ের নাম: গাভী বিত্তান্ত
লেখক: আহমদ ছফা
ধরণ: উপন্যাস
প্রকাশন: হাওলাদার প্রকাশনী
প্রচ্ছদ: হামীম কেফায়েত
প্রথম প্রকাশ: ২০১৬
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০