Home অঞ্চল ও জেলা ভিত্তিক পূরাকীর্তিভিত্তিক ইতিহাসের বই: পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার প্রাচীন নিদর্শন

পূরাকীর্তিভিত্তিক ইতিহাসের বই: পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার প্রাচীন নিদর্শন

0
পূরাকীর্তিভিত্তিক ইতিহাসের বই: পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার প্রাচীন নিদর্শন

ইতিহাস দার্শনিক ইবনে খালদুনের মতে মানবসভ্যতার ধারাবাহিক বিবর্তন ও এই বিবর্তনের ইতিবৃত্ত হলো ইতিহাস। যুদ্ধ বা ক্ষমতার মসনদের ধারাবিবরণী না হয়ে সভ্যতা ও সাধারণ মানুষের জীবনধারার ক্রমপরিবর্তনই ইতিহাসের মৌলিক বিষয়বস্তু হিসেবে ইবনে খালদুনের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে সভ্যতার এই ইতিহাসের খোঁজ পাওয়ার জন্য আমাদের অতীতের পাতায় ফিরতে হয় এবং সেপথে দিকনির্দেশনা পাবার অন্যতম পদ্ধতি হলো পূরাকীর্তি বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিশ্লেষণ। কিন্তু আমাদের প্রচলিত ইতিহাস বইসমূহের মাঝে পূরাকীর্তি বিশেষকরে কোনো নির্দিষ্ট এলাকাকেন্দ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের বর্ননা কদাচিৎ দেখতে পাই।

প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে আমার বরাবর আগ্রহ থাকলেও পূরাকীর্তি পরিব্রাজক বন্ধু ফয়সালের সাথে ধারাবাহিক আলাপচারিতায় তা ক্রমশ অধিকতর আগ্রহে রূপ নিয়েছে। বিশেষভাবে আমি আমার জেলার পূরাকীর্তি বিষয়ক ইতিহাস নিয়ে খুবই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম ঠিক সেইমুহূর্তে বন্ধুবর সওগাতুল হক মারফত “পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার প্রচীন নিদর্শন” বইটি আমার হাতে এসে পৌঁছে। লেখক আরিফ হোসেন এই বইটি পেশাগত কারণে পটুয়াখালী ও বরগুনাতে থাকাকালে একেবারেই প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধান করে নিজ উদ্যোগে রচনা করেছেন। এছাড়াও এই লেখকের “পূরাকীর্তির বরিশাল” নামে আরেকটি বই আগেই প্রকাশিত হয়েছিলো। এটা লক্ষ্যণীয় যে আরিফ হোসেন পূরাকীর্তি বিষয়ক জ্ঞানে একজন আগ্রহী গবেষক এবং তার নিষ্ঠার পরিপূর্ণ স্বাক্ষর তিনি বইতে রাখতে পেরেছেন বলেই আমি মনে করি।

পটুয়াখালী ও বরগুনা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাগরঘেষা জেলা হবার কারণে এখানকার ইতিহাস খুব বেশি পুরনোও নয়। এই এলাকাভিত্তিক এধরনের এটাই প্রথম বই হবার কারণে লেখকের পরোক্ষ তথ্য ( Secondary Information) সংগ্রহের কোনো সুযোগ ছিলোনা বরং ঘুরে ঘুরে নিজেকেই প্রত্যক্ষ তথ্য অনুসন্ধান করতে হয়েছে। লেখক জেলা উপজেলার নামকরণ, সংক্ষিপ্ত পরিচিতির পর একেক উপজেলার অধ্যায়ভিত্তিক প্রাচীন নিদর্শনের বর্ণনা দিয়েছেন।

পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলের বেশিরভাগ পূরাকীর্তিই ধর্মীয় স্থাপনা যেমন মসজিদ, মন্দির, মাজার, প্যাগোডা। তবে পটুয়াখালীর বাউফল যেহেতু চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের দ্বিতীয় পর্যায়ের রাজধানী ছিলো তাই সেখানে রাজদিঘী এবং নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া কিছু স্থাপনার কথা লেখক উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও কয়েকটি মিয়া বাড়ি, মজুমদার বাড়ি, শিকদার বাড়ি, তালুকদার বাড়ির প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এখনো দৃশ্যমান। মসজিদগুলোতে বেশিরভাগ মুঘল স্থাপত্য এবং এক গম্বুজ বিশিষ্ট হলেও এতে নান্দনিকতা এবং আকার আকৃতির বৈচিত্র্য বিদ্যমান। লেখক মানচিত্র এবং রঙিন ছবি যোগ করে লেখাকে আরো বেশি চিত্তাকর্ষক এবং অনুধাবনযোগ্য করে তুলেছেন।

শ্রীরামপুর মিয়া বাড়ি (পরিযান- ফয়সাল)
ব্যতিক্রমী দুই তলা কবর (পরিযান-ফয়সাল)

এই বই পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে সম্প্রতি আমি আর ফয়সাল শ্রীরামপুর মিয়া বাড়ির পূরাকীর্তি দেখতে গিয়েছিলাম। এই বাড়িটি বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খানের দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যারা নবাবের কাছ থেকে এক ভাটায় যতটুকু পথ হেঁটে যাওয়া যায় ততটুকু জমির জমিদারী লাভ করেছিলেন। কালে খাঁ নামে একজন প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন তাদেরই প্রজন্ম যার নামে পটুয়াখালী কালিকাপুর এর নাম করা হয়েছে বলে বলা হয়। শ্রীপুর মিয়া বাড়িতে প্রবেশদ্বার, প্রশাসনিক ভবন, বাসভবন, এক গম্বুজ মসজিদ ও ব্যতিক্রম ধরনের দোতলা কবর দেখতে পাওয়া যায়। যদিও এই নিদর্শনের ব্যাপারে সরকারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো সাইনবোর্ড বা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি।

পটুয়াখালী পাষাণময়ী কালিমন্দির (পরিযান-ফয়সাল)

পটুয়াখালী শহরের কেন্দ্রে রাজেশ্বর রায়ের কাছাড়ি বাড়ি যা এতো দিন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন পরিত্যক্ত এবং তার প্রতিষ্ঠিত একটি পাষাণময়ী কালিমন্দির এখনো বহাল তবিয়তে আছে। সাধারণ কালিমন্দিরের সাথে পাষাণময়ী কালি মন্দিরের পার্থক্য আছে এখানে কালিমাতার বিগ্রহ স্থাপন করতে হলে বেদীর চারপাশে চারটি চন্ডাল এবং একজন ব্রাহ্মণের মাথা পুঁতে রাখতে হয়। জমিদার রাজেশ্বর রায় মামলায় জিতলে পাষাণময়ী কালিমন্দির করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এবং তা করার উপকরণ জোগাড় করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে জমিদারকে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে তা বলা বাহুল্য। এছাড়াও পুরাতন আদালত ভবন, অনেকগুলো মসজিদ ছাড়াও এরকম নানা ঐতিহাসিক এবং থ্রিলিং ইতিহাস সমৃদ্ধ নিদর্শন সম্পর্কে জানতে এই বইটি অনন্য।

পূরাকীর্তি মানুষকে গল্প বলে। এই গল্প চিন্তাজগতে নতুন নতুন মানসিক কাঠামো তৈরি করতে সহায়তা করে। মানুষের অতীতের পথে ফেরার শ্রেষ্ঠতম উপায় এসব চোখজুড়ানো স্থাপত্য অথবা গা ছমছমে গল্পের ইতিহাস পঠন এবং পূরাকীর্তি দর্শন । এছাড়াও নিছক বিনোদনের জন্য হলেও আপনার এলাকার পূরাকীর্তির ইতিহাস আপনার জানা উচিত।

বইয়ের নাম: পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার প্রাচীন নিদর্শন
লেখক: আরিফ হোসেন
ধরণ: ইতিহাস
প্রকাশন: গতিধারা
প্রচ্ছদ: মো. নাছির উদ্দিন
প্রথম প্রকাশ: ২০২০
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪৪
মুদ্রিত মূল্য: ৩৫০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here