Home নির্বাচিত রিভিউ আহমদ ছফার গরু রচনা

আহমদ ছফার গরু রচনা

0
আহমদ ছফার গরু রচনা
গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসের প্রচ্ছদ

আহমদ ছফা আমাদের শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে করে যতগুলো লেখা লিখেছেন সেখানে তিনি সাধারণত রূপক হিসেবে গরু (বাংলা একাডেমির গোরু) নামক প্রাণীটিকে ব্যবহার করেছেন। ছফার প্রকাশিত লেখায় গরু রূপক বর্তমান এমন রচনা সংখ্যা তিনটি: এর মধ্যে গাভী বিত্তান্ত উপন্যাস সবচেয়ে জনপ্রিয়। এখানে তিনি ঘটনাচক্রে এক অযোগ্য ভিসি আবু জুনায়েদের উত্থান এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার বর্ণনা দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আর লেজুরবৃত্তিক শিক্ষক-ছাত্র-রাজনীতির কল্যাণে(?) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য জ্ঞানের সেবা যেনো খোয়াড়ে বন্দী এক গাভীর রূপ নিয়েছে। মহান শিক্ষাগুরু আবু জুনায়েদ মাঝেমধ্যে জ্ঞানরূপী গরুর ওলানে হাত বোলান তবে সে দৃশ্য অন্য কারো কুদর্শনে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়ে যায়। গাভী বিত্তান্ত উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স, সন্দেশ, হাওলাদার সহ আরো কয়েকটি প্রকাশনী থেকে  ১৮০-২২০ টাকা ভিন্ন ভিন্ন দামে কিনতে পাওয়া যায়।

গো হাকিম প্রচ্ছদ

এছাড়া আহমদ ছফা রচিত আরও দুটি গরু কাহিনী আছে যা দুটি কবিতা। এর মধ্যে বেশি পরিচিত গো হাকিমএই সুদীর্ঘ কবিতায় একটি গরুর বাছুরকে পড়িয়ে বিচারক বা হাকিম বানানোর কথা বলার মাধ্যমে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার সাথে আদালত বা ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে ব্যঙ্গ করা‌ হয়েছে। এই কবিতা বর্তমান বাংলাদেশে পিতামাতার মনে সন্তানকে পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট  বানানোর সচেষ্ট স্বপ্নের পেছনে যে ক্ষমতাপ্রাপ্তি ও শ্রেনীউন্নয়নের একটি বাসনা বিদ্যমান তাও অনুধাবন করার জন্য প্রাসঙ্গিক। গো হাকিম কবিতাটি শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ হিসেবে বই আকারে বাজারে পাওয়া যায় কিন্ত গো হাকিমের বর্ণনা শিশুতোষ মনে হলেও এর সারবস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক। খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির পরিবেশনায় সচিত্র গো হাকিম বইটি স্বতন্ত্র বই হিসেবে ২০১৮ সালে বেরিয়েছে যেখানে বইটির দাম মুদ্রিত ১৫০ টাকা এবং পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩৯।

অন্য কবিতাটি হলো গাভীর জন্য শোক প্রস্তাব, কবিতা না বলে এটিকে ব্যঙ্গরচনা বললেই ভালো হয়, যদিও এই লেখাটি আহমদ ছফার লেনিন‌ ঘুমোবে এবার নামে যে কবিতার বইটি আছে সেখানে অন্তর্ভুক্ত আছে। এখানে দেখানো হয়েছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দুইপক্ষের গোলাগুলি চলছে তার মাঝে ঘাস খেতে গিয়ে একটি নিরীহ অস্ট্রেলিয়ান ক্রস গাভী মারা যায়। এর প্রেক্ষিতে ছফা একটি শোক প্রস্তাব পাঠ করতে চান কিন্তু গাভীর অকালমৃত্যুর জন্য দোষী কে? ওই গোলাগুলিরত কোনো পক্ষ নাকি গরুটি নিজেই তেমন একটি দ্বন্দ্ব ছফার আলোচনায় উঠে আসে। শেষপর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন- দোষটি আসলে গরুর বেটিরই সে কেনো এই গোলাগুলির সময়ে এখানে এসে উপস্থিত হলো। এই রূপকের আড়ালে  ছফা সত্যিকারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা যে বিদেশ থেকে অবিকল আমদানি করা একটি প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের দলীয় দালালি ও স্বার্থের লড়াইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা, জ্ঞান উৎপাদন গাভীটির মতো নিরবে মারা পরে যায়। এই নৈরাজ্যের জন্য দোষ কি প্রশাসন, সরকার নাকি আমাদের, সেই সমীকরণ সমাধানে শেষপর্যন্ত আমরা  জ্ঞানটাকেই অহেতুক বাংলায় আগমনের জন্য অপরাধী ভেবে সুখ পাই।

আমি “গো হাকিম” এবং “গাভীর জন্য শোক প্রস্তাব” রচনা দুটি আহমদ ছফার কবিতাসমগ্র থেকে পড়েছি। এ সম্পর্কে সলিমুল্লাহ খান এর “আহমদ ছফার গব্যপুরান” শিরোনামে একটি বিস্তারিত লেখা আছে যা পাঠে পাঠক আরো পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।

বইয়ের নাম: গাভী বিত্তান্ত
লেখক: আহমদ ছফা
ধরণ: উপন্যাস
প্রকাশন: খান ব্রাদার্স

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here