আমার হাতে গোনা কয়েকজন প্রিয় লেখকের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ স্যার অন্যতম। ওনার লেখা নিয়ে আলাদাভাবে বলার কিছু প্রয়োজন বোধ করছি না। এমন কোনো পাঠক আছে কিনা না তা আমার জানা নেই, যিনি তার জীবনে হুমায়ূন স্যারের কোনো লেখা পড়েন নি। ওনার লেখায় কেমন একটা জাদুর মতো কাজ করে সেটা বলে বুঝানোর মতো না। আমি এ পর্যন্ত ওনার যত লেখা পড়েছি সবগুলার মধ্যে নিজেকে একেকটা চরিত্র খুঁজে নিয়েছি। আর মিশে গিয়েছি সেই সব কাহিনীর মধ্যে।
ওনার লেখায় রোমান্টিকতা থেকে শুরু কর রহস্য, থ্রিলারের যেনো কোনো অন্ত নেই। আজ না হয় রহস্য আর থ্রিলারকে একসাথে করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করি। আমাদের সবার পরিচিত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্রগুলা হলো হিমু, শুভ্র, রূপা, মিসির আলি। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে ভিন্নধর্মী, রহস্যময় এক চরিত্র মিসির আলি। আলাদা ভাবে ওনার লেখা মিসির আলীর উপন্যাস ৫/৬ টা পড়লেও গত কয়েকদিন আগে ওনার লেখা মিসির আলি সমগ্র (অমনিবাস) সিরিয়ালি পড়লাম। অমনিবাসের তিন খন্ড নিয়ে বলা শুরু করলে শেষ করা যাবে না। তাই আজ না হয় প্রথম খন্ড (অমনিবাস-১) নিয়েই বলি। হুমায়ূন স্যারের মিসির আলির ওপর লেখা বিশটি উপন্যাসের নয়টি উপন্যাস নিয়ে মিসির আলী অমনিবাস-১ খন্ডটি লেখা। এই নয়টি অল্প কথায় বললাম-
১.দেবী:- এটায় রয়েছে থ্রিলার, হরর, সাইকোলজির দারুন কনভিনেশন। দেবি হলো হুমায়ূন স্যারের একটা পরিপূর্ণ লেখা। এটায় রানু আর নীলুর সাইকোলজিক্যাল ব্যাপরটা সমাধান দেয়নি। ওনি (মিসির আলি) মনে করেন প্রকৃতিতে এমন অনেক কিছু ঘটে যার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। যা ঘটে তাই মেনে নিতে হয়। তাই তো তিনি বলেছন, “প্রকৃতি সব রহস্য মানুষকে জানাতে চায় না। কিছু নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতে চায়। থাকুক না সেইসব রহস্য লুকানো।সব জানতেই হবে এমন কোনো কথা আছে?”
২.নিশীথিনী:- দেবীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা যেনো দেবীর পরবর্তী অংশ। এটাতেও ফিরোজের অলৌকিক আর সাইকোলজির ব্যাপারটা তুলে ধরা হয়। যেখানে ফিরোজ একবার বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে কিছু একটা দেখে ভয় পায়। তখন থেকে অসুস্থ হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে কাল্পনিক এক চরিত্র ফিরোজের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। সেই চরিত্রের মধ্যে একটিনলোহার রড দিয়ে মানুষকে আঘাত করে। কিন্তু পরে সেসব কথা ওর মনে থাকে না। গল্পের শেষ দিকে ফিরোজ মিসির আলিকেও আঘাত করেছিলো। নীলুর চরিত্রের কিছুটা আভাস আছে নিশীথিনীতে, তবে তা পরিপূর্ণভাবে নয়।
৩.নিষাদ:- এটা মূলত মুনিরের অস্বাভাবিক স্বপ্ন নিয়ে লেখা। মুনির স্বপ্নের মাধ্যমে এক পৃথিবী হতে অন্য পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব কল্পনা করে। এক পৃথিবীতে ওর বাবা,মা পরিবার না থাকলেও অন্য পৃথিবীতে সে তার পরিবারকে দেখতে পায়। দুই জায়গার প্রমাণ পাওয়ার জন্য মিসির আলি মুনিরকে সাথে কিছু একটা আনতে বলেন। মুনির সত্যই একটা প্রামণ দেখিয়েছে। এটারও সমাধান পাওয়া যায়নি।
৪.অন্যভুবন:– অসাধারণ একটা উপন্যাস। প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক তিন্নির মাধ্যমে অনেক সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে শেষটা কেমন জানি মেলাতে পারেনি।এখানে আবার অতিরিক্ত ভাবে নীলুর সাথে মিসির আলির বিয়েটা একেবারে অপ্রয়োজনীয় ছিলো।
৫.বৃহন্নলা:- একটা সুন্দর ফিনিশিং ছিলো এটাতে। শুরুতে সুধাকান্ত বাবুর অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে শুরু হলেও মিসির আলি অনেক সুন্দর ভাবে সেটার সমাধান দেখিয়েছিলেন। এটায় অদ্ভুতভাবে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে মিসির আলীর দেখা হওয়ার কথা উঠে আসে। সে যাত্রায় মিসির আলি হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে কিছু কথা লিখেন। কথা গুলা এরকম, “লোকটি বদমেজাজি, অহংকারী। অধ্যাপকদের যেটা বড় ত্রুটি। অন্যদের বুদ্ধিমত্তা খাটো করে দেখা। ভদ্রলোকের তা আছে।”
৬.ভয়:- এটাতে রয়েছে রাশেদুল করিমের সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম। ভালোবাসার উদাহরন। আমার কাছে দারুন লেগেছিলো। গল্পটা শুরু হয় রাশেদুল জামানের চোখের সমস্যা নিয়ে। তিনি ছিলেন একজন গণিতবিদ। একবার গনিতের একটা সমস্যা সমাধান নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। কাজ করতে করতে কোনো এক সময় তিনি ঘুমিয়ে গেলে তার স্ত্রী জুডি তাকে মৃতের মতো মনে করেন আর ওনার একটা চোখের অস্বাভাবিক খোলা থাকা দেখে ভয় পান। একসময় ওনার বা’চোখটা ঘুমের মধ্যে গালিয়ে দেওয়া হয়। কে করেছে এই কাজটি?? ওনার স্ত্রী নাকি ওনি নিজে?? এটা নিয়েই রহস্য।
৭.বিপদ:- এটা মোটামুটি চলনসই। কিন্তু অতি রঞ্জিত হয়ে যায় ব্যাপারটা। শেষে মিলটা অন্যভাবে করলেও পারতো। এটায় গল্পটা শুরু হয় বিড়ালের কথা বুঝতে পারা নিয়ে। আফসার সাহেব নামের এক লোক বিড়ালের ভাষা বুঝতে পারেন। কিন্তু সব বিড়ালের না। ওনার বাসার বিড়ালের। কেন??
৮.অনীশ:- আমার কাছে তেমন ভালো লাগেনি। এটায় কেমন জানি শুরু করলেন!! রহস্য নিয়ে শুরু করলেও শেষটা কেমন জানি গরমিল করলেন। গল্পটা শুরু বুড়ি নামের এক অভিনেত্রীকে নিয়ে। ভালো নাম রূপা। বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি ছোট বেলা হতে মায়ের কাছে বড় হয় অনেক কড়া শাসনের মাঝে। যেখানে তার নিজের ইচ্ছের কোন দাম ছিলো না। নিজের অনিচ্ছা সত্যেও বিয়ে করতে হয় তাকে। তারপর সকল রহস্য শুরু হয় ওর সন্তানকে নিয়ে।
৯.মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য:- শুরুটা হয় কোটিপতি লোক ওসমান গনির মৃত্যু নিয়ে। প্রথম দিকে অনেক রহস্য থাকে সবাই মোটামুটি অতিপ্রাকৃত বিষয়ে বিশ্বাসও শুরু করে। কিন্তু মিসির আলি এখানে নিজেকে অনেকটা ডিটেকটিভ হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। শেষ দিকে সম্পূর্ণ ঘটনার একটা লজিক্যাল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। এটা ছিলো সববকিছু মিলিয়ে একটা সেরা উপন্যাস। যেখানে তিনি দুটি রহস্যের মাঝে আটকে পরেন। কিন্তু একটার সমাধান করলেও অন্যটি করেননি।
মিসির আলীর লজিক্যাল কথা বার্তা, যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা অনেক ভালো লাগার বিষয়।তিনি সমাধান করতে ভালোবাসেন আর এসব তিনি করে শখের বশে টাকার জন্য না। এর একটা পরিপূর্ণ উাহার দেখা যায় “বৃহন্নলা” উপন্যাসে। তিনি অলৌকিকতায় বিশ্বাসী নন। সব কিছুতে লজিক্যাল ব্যাখ্যা খুঁজেন।
তবে অনেকক্ষেত্রে প্রকৃতির কাছে তার হার মানা একেবারে মানা যায় না। আসলে একটু বুদ্ধি-বিচক্ষণতার ব্যবহার করলেই তিনি তা বের করে আনতে পারতেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো যুক্তিবাদী এই মিসির আলিও প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে নানান হোঁচট খেয়েছেন ৷ অলৌকিকতায় অবিশ্বাসী মিসির আলিও নানান বিষয়ের ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেননি,যা তার ব্যক্তিগত নোটখাতায় “মিসির আলী Unsolved” শিরোনামে লিখিত। আসলে লেখক পরোক্ষ ভাবে জগতের অলৌকিক মায়াজাল সমন্ধে কিছুটা ধারণা দিতে চেয়েছেন।
❝সব মিলিয়ে হুমায়ূন স্যারের এই “মিসির আলি” চরিত্রটিতে মানুষের একটা আকর্ষন তৈরি করতে পেরেছেন তিনি। অতিপ্রাকৃত, অলৌকিক, রহস্য, সাইকোলজির খেলা সব মিলিয়ে অমনিবাস খন্ডগুলা একেকটা যেনো একেটাকে ছাড়িয়ে যাবে। হুমায়ূন স্যারের প্রতি রইলো অসীম ভালোবাসা। হুমায়ূন আহমেদরা কখনো হারিয়ে যান না। তারা আজীবন বেঁচে থাকে ভক্তদের অন্তরে। তেমনি হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রও বেঁচে আছে পাঠকের হৃদয়ে। বাস্তব জীবনে কোনো রহস্যের গন্ধ পেলে আজো দর্শক মনে করে সেই কাল্পনিক রহস্য উন্মোচনকারী মিসির আলি চরিত্রের কথা, যে চরিত্রের রহস্যই কিনা কখনো উন্মোচিত হয়নি।❞
বইয়ের নাম: মিসির আলি অমনিবাস-১
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
ধরণ: রহস্য উপন্যাস
প্রকাশন: প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা
প্রচ্ছদ: আলমগীর রহমান
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫১৪
মুদ্রিত মূল্য: ২৭৫ টাকা মাত্র (বর্তমানে ৪৭৫ টাকা)