মিষ্টি একটা মেয়ে তোত্তোচান। একসময় ক্লাশে শখ করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো সে। ক্লাশে অমনযোগী হয়ে বাইরের বাদনাবাজকদের দেখতো বা পাখিদের সাথে গল্প জুড়ে দিতো। এ নিয়ে তার শিক্ষকরা খুবই অসন্তুষ্ট ছিল। তারা তোত্তোচানকে ইশকুল থেকে বের করে দেয়। তবে এটাই কিন্তু তোত্তোচানের শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর কারণ হয়ে দাঁড়ায় একসময়!
তোত্তোচানের মা ওকে “তোমোয়ে গাকুয়ে” ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দেয়, যেখানে ক্লাশঘর গুলো ছিল একেকটা ট্রেনের বগি! বগির জানালা খুলে দিলেই নরম ঝিরঝিরে বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে দিতো। স্কুলের প্রিন্সিপাল “সোসাকো কোবায়াশীর” ছিলেন অত্যন্ত ভালো আর বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি বাচ্চাদের সাথে গল্প জুড়ে দিতেন, মজার মজার সব গল্প করতেন। গল্পে গল্পে অনেক কিছু শিখিয়ে দিতেন ওদের। বাচ্চারা একসাথে হেসেখেলে সব শিখতো। এমনকি টিফিনের ব্যাপারটাও ছিল খুব মজার। ‘সাগর থেকে’, ‘পাহার থেকে’ এসব নামে বাচ্চারা বাড়ি থেকে পুষ্টিকর সব খাবার আনতো। টিফিন খাওয়ার আগে সবাইকে কোনো না কোনো গল্প শোনাতে হতো। এতে ওরা একে অপরকে কৌশলে খুব সহজেই জানতে পারতো।
তোত্তোচান ইশকুলের বাকি বাচ্চাদের চেয়ে অনেক দুরন্ত ছিল। ওর দুরন্তপনায় ওর আগের ইশকুলের শিক্ষকরা বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু কোবায়াশীর মহাশয় সবসময় ওকে স্নেহের সাথে শিখিয়ে পড়িয়ে দিতেন। ইশকুলে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় ছিল না কারও জন্য। যার যা ভালো লাগতো তাই পড়তো। কেউ ছবি আঁকতো, গান গাইতো, কবিতা শিখতো বা ইউরিদিমিক্স শিখতো, কেউ আবার তখন বিজ্ঞানের কোনো মজাদার এক্সপেরিমেন্ট করতে ব্যস্ত। গ্রীষ্মের ছুটিতে ওরা ক্যাম্পিং করতে যেতো, কৃষকদের ফসল ফলানো দেখতো। শুধু বইয়ের বিদ্যাই নয়, ওদের শেখার বিষয় ছিল এর থেকে অনেক অনেক বেশিকিছু।
আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা হলো শৈশব। এ সময়টা হেসে খেলে শেখার বয়স, যে শেখায় কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম থাকবে না। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরকমটা দেখা যায় না। ছোটবেলা থেকেই একটা নিয়মের মধ্যে আটকে যাই আমরা, আমাদের শেখার প্রক্রিয়া। কিন্তু শিশুদের কখনোই ধরা বাঁধা কিছু নিয়মের মধ্যে আটকে রাখতে নেই। ওদের শেখানোর পদ্ধতিগুলো হতে হবে প্রাণবন্ত, রঙিন আর অভিনব। এই বইটা খুব সুন্দরভাবে সেটা বুঝিয়ে দেয়।
এককথায় চমৎকার একটা বই। সহজ, সরল লেখা কিন্তু মনের ভেতর গেঁথে থাকার মতো। তোত্তোচানের রেলগাড়ির ক্লাশঘরে বসে ক্লাশ করা, মাঠে ঘুরে বেড়ানো, ধরা বাঁধা নিয়মের বাইরে থেকে সবকিছু শেখা সত্যিই সব স্বপ্নের মতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতে যখন একদিকে জাপানের আনাচে-কানাচে যুদ্ধের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, “তোমোয়ে” ইশকুলের বাচ্চারা তখন তাদের শৈশবের স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর সময় কাটাতে ব্যস্ত। তোত্তোচানের মা, শিক্ষকের আচরণ, ঘটনার বর্ণণাগুলো হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই উৎকুশিই (সুন্দর)!
বইয়ের প্রচ্ছদটি যেমন সুন্দর আর মিষ্টি, চৈতী রহমানের করা অনুবাদটিও খু্ব সহজ, সাবলীল আর প্রাণবন্ত। ছোট্ট বইটা হাতে নিয়ে পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো, ইশ আমিও যদি তোত্তোচানের সেই ক্লাশঘরে বসে ক্লাশ করতে পারতাম!
লেখক তেতসুকো কুরোয়ানাগি যদি বইয়ের শেষে গিয়ে স্বীকারক্তিতে বলে না দিতেন যে আসলে তিনিই তোত্তোচান তবে হয়তো বোঝার কোন উপায় ই থাকত না যে এটা একটা সত্যিকারের ইশকুল ছিল একসময়, যেখানে বাচ্চার রেলগাড়ির বগিতে বসে ক্লাশ করতো আর মজার মজার সব স্মৃতি জমিয়ে রাখতো।
বইয়ের নাম: তোত্তোচান জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি
লেখক: তেৎসুকো কুরোয়নাগি
অনুবাদক: চৈতী রহমান
ধরণ: আত্নজীবনী
প্রকাশন: দুন্দুভি
প্রথম প্রকাশ: ২০১৮
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৫৬
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০ টাকা