প্রতিটি মানুষের জীবন গল্পময়। প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু গল্প থাকে। জীবনের কাছে মাঝে মাঝে গল্পও তুচ্ছ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে জীবন রূপকথার চেয়েও অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। জীবনের বাঁকে বাঁকে মোড়ে মোড়ে, ঘটনার প্রতি ঘটনায় জন্ম নেয় হৃদয়ের আকুতি -মিনতি, প্রেম- ভালোবাসা, সুখ আর দুঃখ। জীবনের সরল সোজা গল্প ছাড়াও কারো কারো থাকে অদ্ভুত/ব্যাখ্যাহীন কিছু গল্প। স্বভাবতই মানুষ গল্প শুনতে ভালোবাসে কেউ আবার গল্প বলতে ভালোবাসে। কিছু কিছু গল্প কাউকে বলা হয়ে উঠে না হয়তো তা বলার মতও না।
আপনি যদি ভালো গল্প বলিয়ে হোন তাহলে; নিয়াজ মেহেদীর লেখা আওলাদ মিয়ার ভাতের হোটেলে আপনাকে স্বাগতম।
অকালপ্রয়াত বন্ধুর কবরে দু-মুঠো মাটি আর বন্ধু প্রিয় ফুল “রডোডেনড্রন” দিয়ে আসতে উত্তরবঙ্গে রওনা দেয় অরিন্দম। বন্ধুচক্রে অন্য সকল বন্ধু জাগতিক সকল কার্যক্রমে ব্যাস্ত থাকার কারণে সে একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রাতদুপুরে পলাশবাড়ীতে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যায় অরিন্দম। জনবিরল বাজারে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে রাতটা কাটানো যায়। এদিকে তাপমাত্রা পারদের হিসেবে চড়চড় করে নামছে, ঘনীভূত হচ্ছে কুয়াশা, বুকে কাঁপন ধরাচ্ছে রাতচরা পাখির ডাক। মূল রহস্য শুরু হয় এই বাজার থেকে।
উদভ্রান্ত অরিন্দমকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে এক রহস্যময় বেটে মানুষ। গুলি-ঘুপচি নিয়ে যায় আওলাদ মিয়ার হোটেলে যেখানে অরিন্দম এর মতো আটকে পড়া আরো পাঁচজন মানুষকে একত্রে করা হয়েছে । “আওলাদ মিয়া” নামক এই হোটেলের মালিকের অদ্ভুত এক নেশা তা হলো গল্প শোনার নেশা। সে তার হোটেলে হরেক শ্রেণির মানুষকে স্বাগতম জানায়, আপ্যায়ন করেন শুধু গল্প শোনার জন্য। হোটেলের মালিকের চাওয়া খুব সামান্য প্রত্যেককে নিজের জীবনে এমন একটা গল্প বলতে হবে অদ্ভুত আর অস্বাভাবিক। গল্পে গল্পে সারারাত উঠে আসে এমন সব ঘটনা যা আমাদের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দেয়।
সেই রাতে শুরু হলো গল্প বলা, একে একে নুরুন নাহার, সুধাংশু গুপ্ত, সামেদুল, আলাউদ্দিন মন্ডল, অরিন্দম সবাই নিজের গল্প বলা আরম্ভ করলো। আওলাদ মিয়া সহ সাতজন নিজেরা নিজেদের গল্প বলে। মানুষগুলো হরেক জাতের হরেক জায়গার সেখানে যেমন ছিল উত্তর ভঙ্গের মানুষের গল্প ঠিক তেমন ছিল সিলেট, রংপুরের মানুষের গল্প। প্রত্যেক গল্প শেষ করে বাকি সকলে কিছুক্ষণ অবাক করে তাকিয়ে থাকে। এক এক জনের গল্পে যেমন উঠে এসেছে সাফল্য লাভের জন্য জীবন বলিদানের গল্প তেমনি অন্যজনের গল্পে উঠে এসেছে প্রাচীন ইতিহাস বা নিজের প্রিয় কিছু হারিয়ে যাওয়ার গল্প। এই গল্পগুলো যেন তাদের জীবনেরই অংশ যেন চাইলে তাদের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায় না।
তবে পাঠক সাতটি গল্প থেকে আমার যে গল্পটি বেশি ভালো লেগেছে তা হলো মূল চরিত্র অরিন্দম দে’র গল্পটি। এই গল্পের প্লট বা আইডিয়া আমাকে খুব বেশি আকৃষ্ট করেছে। প্লটের শেষদিকে লেখক যেভাবে অদ্ভুত টুইস্টের মাধ্যমে যে ফিনিশিং দিয়েছেন তা বাহবা পাওয়ার যোগ্য।
ভাষাজনিত কারণে সাতটি গল্প থেকে ছামেদুল এর গল্পটি আমার কম ভালো লেগেছে বা বুঝতে অসুবিধে হয়েছে। তবে বুঝতে পারলে গল্পটি দারুণ। খানিকটা ফ্যান্টাসি ধরণের। আওলাদ মিয়ার গল্পটি আরো আকর্ষণীয় করলে ভালো হতো। ছয়জন আলাদা আলাদা মানুষ তাই তাদের ভাষায় বৈপরীত্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই ভাষার ব্যবহার এর জন্য লেখক অত্যন্ত পারদর্শীতা দেখিয়েছেন। লেখকের গল্প বলার ধরণ বেশ সুন্দর, সরল। এই বইয়ে ভালো লাগার দিকগুলোর মধ্যে লেখকের টপিক সিলেকশন অন্যতম। খুবই জমজমাট একটি প্লট নিয়ে অসাধারণ বই লেখেছেনে লেখক। এক বসায় পড়ে শেষ করে ফেলার মতো। তিনি টিপিক্যাল প্যারানরমাল গল্প তুলে ধরেননি। ছয়জন মানুষের জবানীতে গল্পগুলো তুলে ধরেছেন যা গল্পগুলোকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
লেখককে ধন্যবাদ এমন ভিন্ন ধরনের গল্পের মাধ্যমে বইটি তৈরি করার জন্য। বইটি পড়ার সময় আপনার মনে হবে যেন আপনি লেখকের কোনো আড্ডার এক মজলিশে বসে আছেন। সবশেষে বলতে চাই বইটি আপনার বেশ ভালো লাগবে।
বইয়ের নাম: আওলাদ মিয়ার ভাতের হোটেল
লেখক: নিয়াজ মেহেদী
ধরণ: সমকালীন উপন্যাস
প্রকাশন: বাতিঘর প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: ২০১৮
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৯৩
মুদ্রিত মূল্য: ১৪০