Home উপন্যাস অচিনপুর : একটি সাংসারিক উপেক্ষার গল্প

অচিনপুর : একটি সাংসারিক উপেক্ষার গল্প

0
অচিনপুর : একটি সাংসারিক উপেক্ষার গল্প

গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের প্রথম দিকের রচনা অচিনপুর, এটি তার প্রকাশিত তিন নম্বর বই। একটি সম্ভ্রান্ত গ্রামীণ পরিবারের আনন্দ, বেদনা, ঐশ্বর্য, উপেক্ষা আর ভাঙাগড়ার কথা হুমায়ূনের কলমে হয়ে উঠেছে একটি মাস্টারপিস।

অচিনপুরকে শ্রেণীকরণ করলে এটি কিশোর উপন্যাস হিসেবেই মানানসই তবে সব বয়সী মানুষের জন্যই এটি উপাদেয় ব্যঞ্জন বললে অত্যুক্তি হবে না। লেখক পুস্তকের নামেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি পাঠকের জন্য অনাগত পৃষ্ঠায় যে জগতের কথা বলবেন তা অচেনা এক গাঁয়ের, যেখানে মায়া এতোটা গভীর না, যা মানুষের মস্তিষ্কে দাগ কাটে। তবুও সংসার কি আলোকবিজ্ঞানের সূত্রের ব্যতিক্রম হয়ে ভালোবাসার আয়না ছাড়া হয় প্রতিফলিত? এমন গল্পের উপকরণ কোথা পাওয়া যায় যা আমাদের অচেনা? তাইতো চেনা উপাদানের এক‌ অচেনা তীর্যক উপন্যাস অচিনপুর।

গল্পের প্রোটাগনিস্ট রঞ্জু যে বাবা হারিয়ে একমাত্র বোন লিলির সাথে মায়ের কোলে এসে উঠেছিলো নানাজানের এই প্রাচীন বাড়িতে, যেখানে সবসময় চাপা ভয়ের আবহ বিরাজমান। অসুস্থ বড় নানী, গম্ভীর নানাজান, ছোটো নানী, তাবিজ কবজকারী কানাবিবি, রঞ্জুর সমসাময়িক নবু মামা, গান বাজনা আর যাত্রাপালা করে বেড়ানো বাদশা মামা, ঘরের ঝি মোহরের মা, আপন মনে ঘুরে বেড়ানো সফুরা খালাসহ এক বড় তালিকার সদস্যবিশিষ্ট যৌথ পরিবার। সম্পত্তি উত্তারাধিকার সূত্রেই পেয়েছিলেন তাই যোগানের ভাবের সাথে অ যুক্ত হবার কথা ছিল না। কিন্তু জীবন যেনো ষোড়শী মন যা ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়।

সত্যিকারে একজন নারীর বাড়ি কোনটি? যেখানে জন্ম হয়, বেড়ে উঠে তা বাবার বাড়ি, সোমত্তা হলে যেখানে পাঠিয়ে দেয়া হয় তা স্বামীর বাড়ি। আবার স্বামীর বাড়ি থেকে যদি কোনো কারণবশত বাবার বাড়ি এসে আশ্রয়প্রার্থী হন তবে জন্মস্থান বাবার বাড়িতেই মেয়ে হয় চরম উপেক্ষার উপকরণ। রঞ্জুর মা হাসিনাও একই ভাগ্যবরণ করলেও তাকে তা বেশিদিন সইতে হয়নি, রঞ্জুর বয়স যখন আনুমানিক আট তখনই তিনি মাটির তলদেশে পাড়ি জমান। মা হারানোর পর রঞ্জুর সবচেয়ে আপন বড়বোন লিলি থাকলেও তার সাথে রঞ্জু কোনো আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করেনা। যদিও বোন কখনো টাকা পয়সা, আম, আতা ডেকে নিয়ে গোপনে হাতে তুলে দেয়, কাছে ডেকে দুএকটি কথাও বলতে চায় তবে তা রঞ্জুর কাছে করুণা আর উটকো ঝামেলা বলেই মনে হয়। উপেক্ষার জীবন বীজ দিনে দিনে ডালপালা মেলে বড় হতে থাকে, রঞ্জুর একমাত্র কাছের বন্ধু বা সঙ্গী নবু মামাই। একসঙ্গে স্কুল, মক্তব, খেলাধুলা আর ভাবনাহীন জীবন। বাদশা মামা আজব লোক নিজের মতো চলেন। এরমাঝে একদিন মায়ের রেখে যাওয়া গয়নায় বড়বোন লিলি বৌ সেজে এ বাড়ির সদস্যপদ হারায়। কিছুদিন বাদে পরিবারে বাদশা মামার বৌ হয়ে আসেন এলাচি বেগম ওরফে লালমামী। নবু, রঞ্জুর কাছে এলাচি হয়ে উঠেন লালভাবী, লালমামী নামের আরাধ্য দেবী। এলাচিও তা উপভোগ করেন বৈকি। কিন্তু বাদশার সাথে এলাচির সম্পর্ক শিকেয় উঠে বিয়ের আনন্দের রাত না ফুরোতেই। যা ক্রমেই রূপ নেয় দূরত্বের, উচ্ছল বাদশা সন্তানসুখের ক্ষমতা না থাকায় হয়ে যান চুপচাপ, ঘরছাড়া।

এর মাঝে নবুর অসুস্থতার কারণে তাকে বাতাস বদল করতে শহরে এক আত্মীয়ের বাসায় পাঠানো হয় সেখান থেকে সুস্থ এবং যুবক হয়ে ফেরেন বছর দুয়েক বাদে। এই সময়ে রঞ্জু নবু মামাকেও হারিয়ে হয়ে উঠে একাকী বালক যে অপেক্ষা করছে বোনের চিঠি যা হবে এবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার টিকেট। ওদিকে নানাজানের সাথে রহিম শেখের সম্পত্তির বিরোধে সম্পদ কমতে শুরু করে প্রতি মোকদ্দমায়। সংসারে আসে নতুন প্যারডাইম। নবু আর এলাচির মাঝে সখ্যতা ক্রমশ বেড়ে এমন স্কেলে পৌঁছায় যে বাবার বাড়ি থেকে এলাচি বেগম দেবরের হাত ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এই ঘটনা বদলে দেয় পুরো গল্পের স্রোত। বাদশা হয়ে উঠেন আরো উতলা কিন্তু এলাচির প্রতি ভালোবাসায় কাতর। অপেক্ষা করতে থাকেন এলাচির ফেরার। নানা তাবীজ কবজ থেকে একসময় মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন মনের আশা পূরণ হবে এই প্রত্যাশায়। রহিম শেখের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েও হয়না একেরপর এক মামলায়। একসময় নানীর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে রঞ্জু আর লিলি যা পেয়েছিলো তাছাড়া নানার কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনা। এমন সময় এক ঝিরিঝিরি বৃষ্টিস্নাত বিকেলে একটি নৌকা এসে ভীরে বাড়ির ঘাটে, সন্ধ্যা নামতেই ঠিক রঞ্জুর মায়ের মতো ধীরে ধীরে বাড়ির উঠোনে কোলে এক ছোট্ট মেয়েসহ দৃশ্যপটে এসে উপস্থিত হন এলাচি বেগম।

ভাগ্যের নৌকা সংসার নিয়ে কতো ঘাটে নোঙর ফেলে। কত মানুষ এখানে আসে আর চলেও যায়। আপন হয়েও হয়না কতজন। তবুও প্রতীক্ষার চিঠির অপেক্ষায় থাকে মনের গহীন কোণ। চিঠি আসে কোনো একদিন ডাকপিয়ন মারফত আর অচিনপুর থেকে পুরোনো রঞ্জুরা প্রস্থান করে কারণ সেই মঞ্চে আবির্ভূত হবার অপেক্ষায় কড়া নাড়ছে কোনো উপেক্ষিত নতুন রঞ্জু।

বইয়ের নাম: অচিনপুর
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
ধরণ: কিশোর উপন্যাস
প্রকাশন: অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: মাসুম রহমান
প্রথম প্রকাশ: ২০০৯
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৬৪
মুদ্রিত মূল্য: ১২০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here