রুমানা বৈশাখী আপু সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে। একইসাথে তিনি একজন লেখিকা এবং রন্ধনশিল্পী। সাংবাদিক হিসেবেও দীর্ঘদিন যাবত কর্মরত ছিলেন।
‘অতিলৌকিক’ লেখিকার অলৌকিক উপন্যাস। বই আকারে এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১২ তে। বিষয়বস্তু পিশাচ কেন্দ্রিক।
গল্পের শুরুতে আমরা একটি জমিদার বাড়ির নিঁখুত বর্ণনা পাই। বর্ণনাগুলো পাঠকের কল্পনা করে নেয়ার উপযোগী স্পষ্ট এবং প্রাঞ্জল। সচরাচর যেকোনো ধরনের ভৌতিক রচনায় জমিদার বাড়ির উল্লেখ থাকলে সমস্ত ঘটনা আবর্তিত হয় সেই জমিদারবাড়িকে কেন্দ্র করে। সুতরাং এই বইটিতেও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। জমিদার বাড়িতেই মূল ঘটনার সূত্রপাত। নির্দিষ্ট করে বললে বাড়িটির একটি কক্ষ পুরো উপন্যাসটির মূল আকর্ষণ।
উপন্যাসের প্রথমেই যে চরিত্রটিকে আমরা দেখতে পাই তার নাম মুহিদুল। মুহিদুল বর্ণনাকৃত জমিদার বাড়িটির একমাত্র বংশধর। মুহিদুলের বাবা মুহিদুলের মাকে (যিনি একজন হিন্দু নারী) পরিবারের অমতে বিয়ে করায় তার দাদা সৈয়দ আশফাকুল আলম তাদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন কিন্তু দাদী দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর শেষ ইচ্ছা হিসেবে তিনি তার নাতি মুহিদুলকে দেখতে চান। সেই উদ্দেশ্যে দাদাবাড়িতে আসা।
যে ঘরের কথা বলছিলাম সেই ঘরটি সোনা এবং লোহার তালা দ্বারা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখানে বন্ধ বলতে বোঝাতে চাচ্ছি দোয়া-কালাম পড়ে ঘর বন্ধকীকরন। এখন কেন এই ঘর বন্ধ করা হয়েছে সেটি থেকেই মূল ঘটনা শুরু।
পুরো উপন্যাসটি পড়ে আমার প্রতিক্রিয়া হয়েছে মিশ্র ধরনের। সুতরাং, বইটির ভালো এবং মন্দ উভয়দিক এখানে তুলে ধরা আবশ্যক।
ইতিবাচক ব্যাপার হলো পুরো উপন্যাসটিতে লেখিকা থ্রিল নামক ব্যাপারটা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কিছু কিছু উপন্যাসে দেখা যায় লেখক থ্রিলার বা হররের নামে থ্রিলের ছিঁটেফোটাও দিতে পারেন না কিংবা প্রথম অংশে থ্রিলটা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেন না বরং একঘেয়ে হয়ে যায় শেষমেশ, কিন্তু এই জায়গাতে লেখিকা যথেষ্ট সফল। একই চরিত্র বা ঘটনা অহেতুক টানাটানি করে পৃষ্ঠা বাড়ানোর প্রবনতা চোখে পড়ে না।
উপন্যাসের কাহিনী নানারকমের বাঁকসংশ্লিষ্ট। অর্থ্যাৎ, একই বিষয় নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান না করে ছোট বড় নানারকম চরিত্র যোগ করেছেন, কাহিনীতে এনেছেন বৈচিত্র্য। কিছু চমকপ্রদ তথ্যের সংযোজন ঘটিয়ে পাঠককে চমকেও দিয়েছেন। সচরাচর পাঠক একটি অতিপ্রাকৃত ধাঁচের উপন্যাসে এসবই আশা করে।
লেখিকার বর্ণনা জ্ঞান ভালো। বিভিন্ন দৃশ্যের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বর্ণনা দিয়েছেন। সাথে নানারকম খাবারের নাম উল্লেখ করেছেন যা বেশ উপভোগ্য।
এখন উপন্যাসটির সীমাবদ্ধতার দিকে আলোকপাত করছি।
প্রচুর পরিমাণে বানান ভুল পেয়েছি যেটা দুঃখজনক। আমি ‘বইটই’ থেকে পড়েছি, হার্ডকপি পড়িনি তাই ভুলগুলো অ্যাপের যান্ত্রিক ত্রুটি না মূল বইটিতে এমন ভুল রয়েছে তা ঠিক নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় গুরুচণ্ডালী দোষও লক্ষণীয় যা বার বার মনোযোগ নষ্ট করে।
মহিদুল চরিত্রটির উপর আরেকটু কাজ করলে ভালো হতো। পুরো উপন্যাসটি পড়ে মনে হলো এই চরিত্রের উপর খুব কম মনোযোগ দেয়া হয়েছে । মহিদুলের তুলনায় বাকি চরিত্রগুলি বেশ বিকশিত এবং পরিপূর্ণ বিশেষ করে কৃষ্ণা চরিত্রটি।
অনেকগুলো চরিত্র এবং ঘটনা সম্বলিত উপন্যাসটি মাত্র ১৬৬ পৃষ্ঠার। আরেকটু বড় হলে রসিয়ে উপভোগ করা যেত এবং যে সমস্ত প্রসঙ্গের অবতারনা করা হয়েছে সেসব প্রসঙ্গের একটি নির্দিষ্ট পরিণতি দেখতে পেতাম যা অনেক সময়ই পাইনি তাই কিছুটা খাপছাড়া লেগেছে।
পরিশেষে বলি, হরর উপন্যাস হিসেবে বইটি মোটামুটি ভালোই। লেখিকার জন্য শুভকামনা রইল।
বইয়ের নাম: অতিলৌকিক
লেখক: রুমানা বৈশাখী
ধরণ: অতিপ্রাকৃত
প্রকাশন: জাগৃতি প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: ২০১২
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৬৬
মুদ্রিত মূল্য: ৮০ টাকা (বইটই অ্যাপ)