পছন্দের তালিকায় খুব কম সংখ্যক লেখকই বরাবর প্রাধান্য পেয়ে এসেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সেই গুটিকয়েক লেখকদের মধ্যে একজন। আজ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘আরণ্যক’ বইটি পড়ে মনে হলো যেন কিছুটা আকৃষ্ট হলাম। যদিও এর আগে ওনার লিখা অনেক বই-ই পড়া হয়েছে, কিন্তু এটার মতো আকৃষ্ট করতে পারে নাই। লেখকদের স্বার্থকতা বুঝি এখানেই!
মূলত বইটি একটি কল্পনালোকের বিবরণ। আসলেই? এটা কল্পনা ছিল!
পুরো বইটা শেষ করে একবারের জন্যও মনে হয় নাই; যে বইটি ছিল লেখকের শহুরে জীবনে মানুষের বসতির পাশে থাকতে থাকতে নিবিড় অরণ্যের খোঁজে, বাদামতলায় বসে শেষ বিকেলের একটা কল্পলোকে ভ্রমণ।
নায়ক সত্যচরণ কোনো জমিদারী এস্টেটে চাকরি পেয়ে ম্যানেজার হিসেবে ‘ভাগলপুর’ গিয়েছেন। ভাগলপুর অঞ্চলটা ছিল- অরণ্যে ঘেরা, আদিম যুগের মানুষগুলো যেমন বনে জঙ্গলে ঘুরে বেরিয়ে, চাষাবাদ করে কোনমতে দিন কাটাত ঠিক তেমন। একদম শুরুতে সত্যচরণের নাগরিক মন এই অরণ্যপ্রবাসের বিরুদ্ধ করলেও পরবর্তীতে প্রকৃতির নিবিড়তা তাকে একটু একটু করে মুগ্ধ করেছে। তারপর আর কিছুতেই যেন তার মন এই নিবিড় বন্ধন থেকে ছিন্ন হতে চায় না, অরণ্য থেকে সামান্য বিচ্ছেদও যেন তার সহ্য হয় না।
সেখানে থাকতে থাকতে সত্যচরণ ও প্রকৃতিপ্রেমী যুগলপ্রসাদ মিলে বন্যপ্রকৃতিকে সজ্জিত করে নানান দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষ ও বাহারী লতাপাতার গাছ লাগিয়ে। তারা বহু দূরদূরান্ত থেকে কোন সৌন্দর্যবর্ধক ফুলের গাছ দেখলেই সংগ্রহ করে এনে লাগাত অরণ্যের একপ্রান্তে সরস্বতী হ্রদে। কিন্তু চাকরির খাতিরে মনিবের স্বার্থরক্ষার জন্য সত্যচরণকে অরণ্যের প্রায় সব জমিই চাষাবাদের জন্য প্রজাবিলি করতে হয়েছে। প্রজারা তাদের চাষাবাদের জমি তৈরি করবার জন্য নষ্ট করেছে হাজার হাজার বিঘা বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমি।
আদিমকালের বন্যভূমি থেকে সভ্যতায় ফিরে আসবার যে ধীরগতির বিকাশ, তাই যেন লেখক ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তার লেখনীতে। সাথে সাথে নিজহাতে এবং স্বচক্ষে এ অরণ্যভূমি ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে লেখকের মন যেন আজও শোকাহত। আর সে শোকের বহিঃপ্রকাশ থেকেই উক্ত ‘আরণ্যক’-এর সৃষ্টি।
- সত্যচরণ কী সত্যিই নিজহাতে গড়া নানান সৌন্দর্যে ঘেরা সরস্বতী কুন্ডি তছনছ হতে দিয়েছিলেন?
- সে অরণ্যের প্রকৃত সৌন্দর্য কী বইটিতে উল্লেখ আছে? সেই অরণ্যের জীবনযাপন কেমন, তা এই বই পড়ে কতটুকুই উপলব্ধি করতে পারব?
এসব অসংখ্য প্রশ্নের ভরপুর উত্তর একদম সুনির্মিত নিয়মনীতিতে সাজানো রয়েছে বইটিতে। মনে হবে বন্যভূমি যেন কতটা আপন, কতটা স্নিগ্ধ। আসলে এই শহরমুখী জীবনের ব্যস্তসময়ের ফাঁকে একটু অবসরে এমন একটি বইকে আপন করে নিতে পারলে আর কী চাই? যেখানে আছে প্রকৃতির কৃত্রিম ছোঁয়া আর বাস্তবতার শুদ্ধতা।
বইয়ের নাম: আরণ্যক
লেখক: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
ধরণ: উপন্যাস
প্রকাশন: নাঈম বুকস ইন্টারন্যাশনাল
প্রচ্ছদ: ট্রয় গ্রাফিক্স ইন্টারন্যাশনাল
প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৭-১৯৩৯
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১২৮
মুদ্রিত মূল্য: ১২০