Home উপন্যাস মেঘডুবি: বিষণ্ণতায় মাখানো মানুষের গল্প

মেঘডুবি: বিষণ্ণতায় মাখানো মানুষের গল্প

মেঘডুবি: বিষণ্ণতায় মাখানো মানুষের গল্প
মেঘডুবি উপন্যাসের প্রচ্ছদ

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামার আগে কখনো আকাশের দিকে তাকিয়েছেন? দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগেই আঁধার কালো মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ। সাথে কিছু সাদা কিংবা ছাই রঙের মেঘও দেখা যায়, তারা অবশ্য সংখ্যায় কম। মনে হয় যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। উথালপাথাল বাতাসে এলোমেলো চারপাশ। একটা দুটো করে বড়ো বড়ো ফোঁটায় পড়তে শুরু করে বৃষ্টি। সময় যত যায় তত বৃষ্টির বেগ বাড়ে। দমকে দমকে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় বাতাস। আকাশের দিকে তাকালে তখন দেখা যায় মেঘেরা নেই। পুরো আকাশ তখন ছাই রঙা। কালো, সাদা, ছাইরঙা মেঘগুলো একসাথে মিলে বিষণ্ণ ছাই রং হয়েছে। পুরো আকাশ জুড়ে আছে সেই বিষণ্ণ রং। খোলা প্রান্তরে সবুজের বুকে দাঁড়িয়ে কিংবা ইট পাথরের শহরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গ্রিলের ফাঁকে দেখা সেই আকাশ মনে এক ধরণের দুঃখবোধ তৈরি করে। বাতাসের বেগ তখন কিছুটা কম। হালকা বাতাসের সেই শীতল স্পর্শ মনে এক ধরণের অদ্ভুত প্রশান্তির জন্ম দেয়। জনপ্রিয় লেখক কিঙ্কর আহসানের লেখা ‘মেঘডুবি’ মনের ভেতর সেই দুঃখবোধ ও প্রশান্তির এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি করে। দুঃখবোধ তৈরি হয়েছে চরিত্রদের পরিণতির জন্য আর প্রশান্তি দিয়ে গেছে লেখকের কালো অক্ষরেরা।

“কিছু ভুল ইচ্ছে করেই করি,

ওতে আমার ছাপ থেকে যায় জানো?

আমার মতো অন্য কেউ তো নেই,

ব্যথা দিলে খুব লাগে তা মানো?”

না, এগুলো আমার কথা না। উপন্যাসের প্রতিটা পর্ব শুরু করার আগে পর্বের আবহ অনুযায়ী একটি করে পদ্য দেওয়া আছে। এটি তেমনই একটি পদ্য কিংবা ছড়া।

সাঙ্গু নদীতে রাজা পাথরের পাশে ভেসে উঠলো একটি লাশ। বাড়ি ফেরার পথে তার সাথে দেখা হলো কিশোর ক্রাইতের। ভীত কিশোর যেন শুনতে পেল লাশ কথা বলছে! চিরচেনা সাঙ্গু নদী কী একটু অচেনা লাগলো কিশোরের? এই লাশের সাথে সাক্ষাৎ পর্বই কাল হলো কিশোরের। থানা-পুলিশ করতে গিয়ে সেখানে দেখা হলো এক লেখকের সাথে।

লেখক যে স্বপ্ন দেখে একটি ঠিকঠাক সিনেমা বানানোর। কিন্তু সে নির্মম, ভীষণ নির্মম। সিনেমাই তার সব, তাই তো তাহমিনাকে সে দেখেও দেখে না। তাহমিনা অভিমানে ডুকরে কাঁদে, কল্পনায় ঘর সাজায়, লেখকের সাথে শব্দ দিয়ে ঘর সাজায়।

শুধু কী লেখক দিয়ে সিনেমা হয়? ওতে শিল্পী লাগে, প্রযোজক লাগে, পরিচালক লাগে, লাগে ইনভেস্টর। তাই ধীরে ধীরে উপন্যাসে আসতে শুরু করে শিশির, সুকণ্যা, স্টারলিং, হীরন সাহেব আরো অনেকে। আসে মনজুর, শিক্ষক সাচিং, ক্রাইতের বাবা ফুপি, সুকণ্যার বাবা মা, সালমা, অ্যামেলিয়া আরো।

প্রকৃতির কোলে বড়ো হওয়া কিশোর ক্রাইত।

বাবা, মা, দুই ছেলে আর তাহমিনাকে নিয়ে এক সাজানো সংসার, সুখী পরিবার। ভাইয়ের বিয়ে, বাবা মায়ের মৃত্যুর পর সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু। ছোটো ভাই চলে যায় বিদেশে, পরিশ্রম করে টাকা পাঠায়। ছোটো বোন তাহমিনা ডাক্তার হবে। কিন্তু, তাহমিনা তখন ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে আছে। লেখকের ভালোবাসায়।

লেখক যার একটা গোপন অতীত আছে। কাউকে সে অতীত জানাতে চায় না। সব ছাপিয়ে সে খ্যাতি চায়, ভালো একটা সিনেমা বানিয়ে তাক লাগাতে চায়।

বিদেশের মাটিতে যখন ভাগ্যের উপর বিশ্বাস শেষ হয়ে গিয়েছিল শিশিরের। ঠিক তখন অ্যামেলিয়ার সাথে পরিচয় তার। ভাগ্য খোলে শিশিরের। ভালোবাসায় যাকে কাছে টেনে নেয় অ্যামেলিয়া একদিন আসল পরিচয় মেলে তার। ছাড়াছাড়ি হয়। কিন্তু ততদিনে কোল জুড়ে এসেছে কন্যা সালমা। শিশির এই দুনিয়ার সবথেকে সুন্দর সম্পর্কটির মায়ায় পড়ে। সে তার কন্যার মায়ায় পড়ে।

গুজরাটি মা আর পাঞ্জাবী বাবার একমাত্র মেয়ে সুকণ্যা বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে, বাংলা গানের প্রেমে পড়ে। স্টারলিংকে ছেড়ে তাই মুম্বাই এ আসে। ঘটনাচক্রে এসে পড়ে এই উপন্যাসের পাতায়।

সিনেমার কাজ একসময় বন্ধ হতে বসে, টাকা নেই। কে দিবে টাকা? এগিয়ে আসে হীরন সাহেব। টাকার বিশাল পাহাড় তার। টাকা দিয়ে খরিদ করতে পারেন সব। টাকা দিয়ে খরিদ করেন শরীর, ক্ষমতার জোরে নগ্ন করেন শরীর। মানুষকে ডুবিয়েই তো ভেসে উঠেছেন তিনি। মানুষকে ডুবিয়েই তো ভেসে উঠে হীরনের মতো মানুষেরা।

এক সিনেমার জন্য একে একে যুক্ত হয় সবাই। গল্প এগোতে থাকে, সিনেমা চলতে থাকে। তারপর? সিনেমা কী হলো? তাহমিনা কী বাস্তবে সংসার পেল? সুকন্যা, শিশির, লেখক, ক্রাইত তাদের পরিণতি কী হলো? কোন মেঘটা ডুবলো বেলাশেষে?

লেখক হয়তো দুঃখবোধের গল্প লিখতে ভালোবাসেন। তাইতো লাশ দিয়ে যে উপন্যাসের শুরু তার শেষ হয় এক ভীষণ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু দিয়ে। কিংবা কে জানে, এই মৃত্যুই হয়তো সবচেয়ে বেশি কাঙ্ক্ষিত ছিলো। পরতে পরতে প্রকৃতির রূপের ছটায় ভুলিয়ে কিছু চরিত্রের মাধ্যমে আমাদের এক বিষাদ মেঘের গল্প বলে গেলেন।

পাতার পর পাতা উল্টিয়ে যত উপন্যাসের দিকে আগানো যায়, তত যেন লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয় মেলে। ভালোবাসা, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, বাবা মায়ের জন্য ভালোবাসা, গোপন অতীত কী নেই এতে? ওই বৃষ্টি শেষের আকাশের মতো এই গল্প মনে দুঃখ জাগালেও লেখার মুন্সিয়ানায় তা সুখপাঠ্য।

তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। গল্পের শুরুতে লেখক বলেছেন এই উপন্যাসের সকল চরিত্র কাল্পনিক। কিন্তু বই শেষে লেখক দাবি করলেন উপন্যাসের অনেক চরিত্রের সাথেই সাক্ষাৎ হয়েছে তার। কোনটা সত্যি সেটা লেখকই হয়তো ভালো বলতে পারবেন।

বইয়ের নাম: মেঘডুবি
লেখক: কিঙ্কর আহসান
ধরণ: উপন্যাস
প্রকাশন: অন্বেষা প্রকাশন
প্রচ্ছদ: রহমান আজাদ
প্রথম প্রকাশ: ২০২০
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩০২
মুদ্রিত মূল্য: ৪৭০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here