“আমার দেখা নয়াচীন” জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিনির্ভর ভ্রমণকাহিনী। ১৯৫২ সালে ২-১২ অক্টোবর চীনের পিকিং এ এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে যোগদানকালে সদ্য বিপ্লবোত্তর গণচীনের সার্বিক অবস্থা তিনি নিজ ভাষায় লিপিবদ্ধ করেন ১৯৫৪ সালে কারাগারে অবস্থাকালীন।
একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জাতির জনক যে তাঁর চীনসফরকে রীতিমতো ফলপ্রসূ এক শিক্ষাসফর হিসেবে বিবেচনা করতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার রচিত এই গ্রন্থে। জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ে পুরো জীবন উৎসর্গ করে দেয়া এই মহান নেতা গণচীন সফরকালীন সেই দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ও তৎকালীন সরকারের শাসন-ব্যবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণে তৎপর হয়েছিলেন শুধুমাত্র কৌতূহলবশত নয়। একজন তরুন রাজনৈতিক নেতা এবং স্বাধীন সোনার বাংলার ভবিষ্যত রুপকার হিসেবে তিনি একটি স্বাধীন দেশ গঠনে প্রাথমিক ধারনা অর্জনেও প্রয়াসী ছিলেন।
এখানেই মূলত একজন সাধারণ ভ্রমণকারী এবং একজন ভাবি রাষ্ট্রনায়কের তফাৎ।
জাতির পিতার রচিত বইগুলোর সাথে যারা অল্পবিস্তর পরিচিত তারা লেখকের চিরপরিচিত লেখার ধাঁচের সেই স্বাদ এই বইটিতেও পাবেন। সহজ-সরল প্রাঞ্জল লেখা, অকপটে প্রকাশ করার যে সরল ভঙ্গি তার তুলনা নেই। যদিও লেখক আগে থেকে পাঠকের কাছে তার পেশাদার লেখক না হওয়ায় পুরো ভ্রমণের যথাযথ বর্ণনা দিতে পারেননি বলে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। পুরোটা নিজের ভাষায় নিজের মতো করে লেখা।
সান-ইয়াৎ-সেন এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী চিয়াং-কাইসেক ছিলেন চীনা জাতীয়তাবাদী দলের একজন প্রভাবশালী সদস্য। পরবর্তীতে সান-ইয়াৎ-সেনের মৃত্যু হলে তার স্থলাভিষিক্ত হোন এই চিয়াং কাইসেক এবং একসময় চীনের অঘোষিত নেতায় পরিণত হোন। কিন্তু তার শাসনকালে জনগণ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হলে চিয়াং কাইসেকের পতন ত্বরান্বিত হতে থাকে এবং জনগনের হাত ধরে চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সে তুং এর আবির্ভাব হয়।
উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়- “চীনের গৃহযুদ্ধের মূল যুদ্ধ ১৯৪৯ সালে সমাপ্ত হয়। রিপাবলিকানদের চীনের মূল ভূ-খন্ড থেকে তাইওয়ানে বিতাড়িত করা হয়। মূল চীনে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালের ১ লা অক্টোবর মাও সেতুং গনপ্রজাতান্ত্রিক চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।”
আমাদের জাতির পিতা যেহেতু কমিউনিস্টপন্থী নন তাই খুব নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি চেয়েছিলেন সদ্য বিপ্লবোত্তর চীনের নেতৃবৃন্দ তাদের এই বিপুল জনগোষ্ঠী নিয়ে কিভাবে দেশ চালাচ্ছে। তাই কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো রিক্সায় ঘুরে ঘুরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তিনি কথা বলেছেন সে দেশের মানুষের সাথে। তাদের জীবনাচরণ, দেশটির শিল্প-বানিজ্য, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি, শিক্ষাব্যবস্থার ধরন, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, নারীদের জীবন ও তাদের অধিকার ইত্যাদি সম্পর্কে যতভাবে পারা যায় জানার চেষ্টা করেছেন।
সচরাচর খুব তথ্যবহুল বা নন-ফিকশন বইগুলো সামান্য কঠিন হয়, তথ্যের ভারে বইয়ের ভাষা প্রাঞ্জলতা হারিয়ে থাকে। কিন্তু এখানে সেটি ঘটেনি। পড়ে অনায়াসে তথ্য বা ঘটনাগুলো হৃদয়াঙ্গম করা যায়।
লেখক বইটিতে চীন দেশের ব্যাপারে দুদিকের উপর আলোকপাত করেছেন।
১. সেই দেশের নেতৃবৃন্দের জাতীয়তাবোধ
২. দেশ গঠনের জনগনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং দেশের আইনের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা।
একটা দেশ ধীরে ধীরে কিভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় তা লেখক নিজের চোখেই অবলোকন করেছেন এবং তাঁর গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার বলে তৎকালীন চীন দেশের যে ভবিষ্যতবাণী তিনি করেছিলেন তার বাস্তবরুপ আমরা আজকের চীন দেশকে দেখে অনুধাবন করতে পারি। যদিও স্বাধীন, দৃঢ়চেতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকামী মানুষ হিসেবে কমিউনিস্টপন্থীদের নিজ জনগণের মতামত প্রকাশের কড়াকড়ি আরোপ লেখক পছন্দ করেননি।
যেকোন মতাদর্শের পাঠকের উচিত “আমার দেখা নয়াচীন” বইটি একবার পড়ে দেখা।
বইটির ভূমিকা লিখেছেন জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যা ও বাংলাদেশের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বইয়ের নাম: আমার দেখা নয়াচীন
লেখক: শেখ মুজিবুর রহমান
ধরণ: ভ্রমণ সাহিত্য
প্রকাশন: বাংলা একাডেমি
প্রচ্ছদ: তারিক সুজাত
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২০। মাঘ ১৪২৬
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২০০
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা