Home উপন্যাস হুমায়ূন আহমেদের ‘নবনী’

হুমায়ূন আহমেদের ‘নবনী’

0
হুমায়ূন আহমেদের ‘নবনী’

বইয়ের গল্প শুরু এক উঠতি বিকেলে। নবনী ঘুমিয়ে থাকে। তার মা অতি আদরে ডেকে ঘুম ভাঙান। হাতমুখ ধুতে গিয়ে ছোট বোন ইরার কাছে জানতে পায় সেদিন রাতেই তার বিয়ে। বিয়ের আয়োজন করেছেন তার বড় মামা। বড় মামা খুব গোছানো একজন মানুষ যার প্রধান কাজ হলো পরোপকার করা অথচ তাকে কেউ পছন্দ করে না, তার পরিবারের লোকজনেও না। নবনীর একটা অন্ধকার অতীত আছে। সেই অতীতকে বারবার সামনে এনে তার বিয়ে ভেঙে দেয় এলাকার লোকজন। আগে বহুবার শেষ মুহূর্তে গিয়ে বিয়ে ভেঙে গেলেও এবারে নবনীর বিয়েটা হয়ে যায়। বাসর রাতে তার বর নোমান ঘুমিয়ে যায় কিন্তু সে ঘুমাতে পারে না। জেগে জেগে তার অতীত নিয়ে ভাবতে থাকে।

নবনী মনে করতে পারে না কী ছিলো সেই অতীতে। মাঝখানের বেশ বড়ো একটা সময় তার কাছে পুরোপুরিভাবে ফাঁকা হলেও সে তার কলেজের ইতিহাস শিক্ষকের কথা নিখুঁতভাবে মনে করতে পারে। মনে করতে পারে কলেজের শ্রেণিকক্ষে মওলানাদের মতো জোব্বা পরা, চোখে সুরমা লাগানো সেই ইতিহাস শিক্ষককে তারা সবাই মিলে কীরকম হেনস্থা করতো। মজা করতে করতে একদিন সেই চেংড়া-হুজুরের সাথে তার চোখাচোখি হয় এবং সে মুগ্ধ হয়ে স্যারের চোখ দেখে।

নবনীদের বাড়িতে খালি দুই কামরায় সেই স্যার ভাড়াটে হিসেবে উঠে আসেন। নবনীর বাবা খুব আগ্রহ নিয়ে তাকে ঘরভাড়া দেন কিন্তু নবনীর কাছে ব্যাপারটা ভালো লাগে না। নবনী শিরিষ গাছের ছায়াঢাকা ছাদে ঘুরতে পছন্দ করে। ছাদে ঘুরতে ঘুরতে সে দেখে স্যার বারান্দায় রান্না করছেন, স্যারের পাশে বুড়োমতো এক কাক দাঁড়িয়ে আছে। এই অদ্ভূত দৃশ্য দেখে মজা পায় সে। ছাদে দাঁড়িয়ে পাশে কাক নিয়ে স্যারের রান্না করার দৃশ্য নিয়মিত দেখতে দেখতে একটা সময়ে নবনী বুঝতে পারে সে স্যারকে পছন্দ করে। কেবল পছন্দ না, অসম্ভব পছন্দ করে। স্যারকে বেনামিতে দুইটা চিঠিও লিখে পাঠায়। এরপর খাতা কিনে এনে চিঠি লিখতে শুরু করে। সে ঠিক করে ৩৬৫ দিনের প্রত্যেকদিন সে একটা করে চিঠি লিখবে। এক বছর বাদে সে স্যারকে সেই খাতাটা ধরিয়ে দিয়ে চিঠিগুলি পড়তে বলবে৷

একদিন ছাদে ওঠার পর নবনী দেখে স্যার চাটাই দিয়ে বারান্দা ঢেকে দিয়েছেন। রাগে ফুঁসতে থাকে সে। চাটাই দিয়ে বারান্দা ঢেকে দেয়ায় স্যারকে কয়টা কঠিন কথা শোনাবার জন্য ছটফট করতে থাকে। সেদিনই তালের পিঠা দেয়ার উসিলায় সে সেই সুযোগ পেয়ে যায়। স্যারকে তার পোশাক আর ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করতে দ্বিধাবোধ করে না সে। এর বদলে স্যার তাকে শান্তভাবে বুঝিয়ে দিতে চান কেন চাটাই দিয়েছেন। নবনী প্রবল তেজের কাছে স্যারের কোনো কথাই ধোপে টেকে না।

এর মাঝে নবনীর ছোটখালার ননদের বিয়েতে যাবার দাওয়াত এড়িয়ে গিয়ে নবনী বেকায়দায় পড়ে যায়। কারণ তার ছোট বোন ইরা আর স্যার যাচ্ছেন বিয়েতে। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর ইরা আগ্রহ নিয়ে অনেক গল্প করতে চায় কিন্তু নবনী জিদ করে তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দেয় না। এর কিছুদিন পর স্যার অসুস্থ হয়ে গেলে পর স্যারের জন্য খাবার নিয়ে যেতে থাকে নবনী। স্যার তাকে জানান তিনি এতিমখানায় বড় হয়েছেন, জীবনে কারো কাছ থেকে কোনো ভালোবাসা পান নাই। একদিন ঝড়তুফানের রাতে নবনী স্যারের ঘরে খাবার নিয়ে গেলে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। স্যার উঠে মোমবাতি জ্বালাতে চান কিন্তু নবনী তাকে সে সুযোগ দেয় না।

একদিন নবনীর বাবার কাছে স্যার নবনীকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব নিয়ে আসেন। নবনীর বাবা ক্ষেপে যান। নবনীর কাছে জানতে চাইলে নবনী বলে দেয় সে এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। নবনীর বাবা অন্ধ আক্রোশে ক্ষিপ্ত হয়ে স্যারের সব জিনিসপত্র ছুঁড়ে বাইরে ফেলতে থাকলে এলাকার লোকজন জড়ো হয়ে যায়। সেই ভিড় ক্রমশঃ বাড়তে থাকে, সেই সাথে তাদের আক্রোশও। হাজারখানিক লোক মিলে স্যারকে ধরে এনে ইট দিয়ে মাথা ছেঁচে দেয়। চরম কষ্ট আর অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে স্যারের মৃত্যু হয় রাত দুইটার দিকে। যে ট্রেনে স্যার মারা যান, একই ট্রেনে নবনীও নেত্রকোনা থেকে ময়মনসিংহ যাচ্ছিলো কিন্তু সে এসবের কিছুই জানতে পারে নাই। তাকে জানতে দেয়া হয় নাই। নবনীর বড় মামা ঢাকায় বাসা ভাড়া করে নবনীকে সাথে নিয়ে থেকেছেন, নবনীর চিকিৎসা করিয়েছেন। সে সম্পূর্ণ সুস্থ হবার পর তাকে তার বাবা-মায়ের সংসারে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

বিয়ের পরদিন নবনী ঢাকায় আসে স্বামী নোমানের সাথে। নোমানকে তার বিয়ের রাতেই ভালো লেগে যায়, তার জন্য মায়া জন্মে যায়। অফিসের পেছনেই ছোট্ট এক কামরার বাসায় তার সংসার শুরু হয়। নোমানকে সে ভালোবাসে, নোমানও তাকে ভালোবাসে কিন্তু নবনী বুঝতে পারে নোমানের বন্ধু সফিক আর তার বউ অহনার প্রত্যেকটা কথাই নোমানের কাছে শিরোধার্য। সে নবনীকে একলা বাসায় ফেলে রেখে সফিক আর তার বউয়ের সাথে শর্টফিল্ম তৈরির জন্য ছোটাছুটি করে, অহনাকে নিয়ে পামিস্টের কাছে ছুটে যায়, সফিকের সাথে রাগ করে অহনা উধাও হয়ে গেলে নোমান তাকে খুঁজে বের করে। নোমানের কাছে নবনী জানতে পারে অহনা আগে খুব অভাবী ছিলো। সফিক বিভিন্ন সময়ে টাকা দিয়ে সাহায্য করে তাকে কিনে নিয়েছে। একটা সময়ে অহনাকে বিয়ে করেছে, ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার উসিলায় সফিকের সব সম্পদের মালিকানা এখন অহনার হাতে।

বিয়ের দশ মাসের মাথায় নবনী তার বাবা-মায়ের কাছে যায়। দশ দিন বাদে ফিরে এসে দেখে বাসার সাজসজ্জা বদল করা হয়েছে। নোমান জানায় অহনা সফিকের সাথে রাগ করে তার এখানে থাকতে এসেছিলো। সেই সাথে এও জানায় সফিক তাকে আর আগের মতো করে বিশ্বাস করতে পারছে না, সন্দেহ করছে। নোমানকে একটা খুশির খবর দিতে চেয়েও দেয়া হয় না।

শর্টফিল্মের একদম শেষের দিকের শ্যুটিং করার সময়ে নবনীকেও সাথে নিয়ে যায়। শ্যুটিং শেষে তারা চারজন নৌকায় শুয়ে-বসে থাকে। অহনা হঠাৎই জানায় সে ঢাকায় ফিরত যাবে, পরদিন আর শ্যুটিং করবে না। সফিক সবাইকে নিয়ে একসাথে ফিরতে চাইলে অহনা নবনীকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য করে এবং নোমানকে নিয়ে চলে যায়। অহনার কথা শুনে নবনীর পুরনো অসুখটা ফিরে আসে। দুর্বিষহ কষ্টে ছটফট করতে করতে সে সফিককে জানায় তার ভেতরে তিন মাসের একটা প্রাণ আছে, সে তাকে হারাতে চায় না। রক্তে ভাসতে ভাসতে নবনীর মনে হয় এই একই রকম পরিস্থিতি তার জীবনে আগেও এসেছিলো, এই একই অনুভূতির ভিতর দিয়ে সে আগেও গেছে। নবনীর মনে হতে থাকে সে মরে যাচ্ছে। মরবার আগে সে নোমানকে বলে যেতে চায় নোমান যেন তাকে মাফ করে দেয়, যেন এতিমখানা খুঁজে তার মেয়েটাকে বের করে এনে নিজের কাছে রাখে। নবনী নোমানকে ভালোবেসেছিলো। নবনীর মেয়েকেও নোমান অবশ্যই ভালোবাসতে পারবে। কারণ সে নবনীরই একটা অংশ।

পরিশিষ্ট: করোনা মহামারির শুরুর দিকটায় যখন বন্দী থেকে থেকে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম, আমার সময় যেন ভালো কাটে সেই জন্য এক ছোটো ভাই বেশ ঝামেলা করে আজিজ মার্কেট থেকে কিছু বই কিনে পাঠিয়েছিলেন। অসম্ভব অস্থিরতার কারণে কয়েক মাস আমি কোনো বই পড়তে পারি নাই। গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাতে সুনামগঞ্জ যাবার পথে ট্রেনে ওঠার পর তিন পৃষ্ঠা পড়ে ফেললাম। সুনামগঞ্জে যাবার পর আরো দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর বইয়ের পুরো কাহিনীটা মনে পড়ে গেলো। বই ব্যাগে নিয়ে পাহাড়-নদী-হাওড় ঘুরে বেড়িয়েছি কিন্তু পড়তে সাহস পাই নাই। ঢাকায় ফেরার কিছুদিন পর এক শেষ বিকেলে একদম প্রথম থেকে আবার শুরু করলাম। দুই ঘণ্টার মাথায় হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বই শেষ করলাম।

বইয়ের নাম: নবনী
লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
ধরণ: উপন্যাস
প্রকাশন: সময় প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: ২০১৬ (১৮শ মুদ্রণ)
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১২৮
মুদ্রিত মূল্য: ২০০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here