Home আত্ম-উন্নয়ন, মোটিভেশনাল ও মেডিটেশন স্বপ্নডানা : আকাশ ছোঁয়ার গল্প

স্বপ্নডানা : আকাশ ছোঁয়ার গল্প

স্বপ্নডানা : আকাশ ছোঁয়ার গল্প

মানুষ কি আসলেই কখনো ওই দূরের আকাশ ছুঁতে পারে? কখনো সেই আকাশের সমান বিশালতার অধিকারী হতে পারে? হয়তো আক্ষরিক অর্থে পারে না। কিন্তু তার কর্ম আর হৃদয়ের কোমলতা আসীন করতে পারে বিশাল উচ্চতায়। যেখান থেকে তাকালে এই মহাবিশ্বকেও হয়তো বিন্দুসমান বলে মনে হবে। স্বপ্নডানা, আকাশ ছোঁয়ার গল্প। এই হলো গল্পের বইয়ের শিরোনাম। হৃদয় আর কর্ম দিয়ে আকাশ ছোঁয়ার কিছু গল্প নিয়েই মূলত বইটি লেখা হয়েছে। তাই নামকরণ এখানে সার্থক।

বইয়ের লেখক বাদল সৈয়দ। চট্রগ্রামের আলো বাতাসে বড়ো হওয়া এই মানুষটি বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি করে যাচ্ছেন নানা ধরণের সামাজিক কর্মকান্ড। মানুষকে ভালোবাসেন তিনি। তাই ধর্ম, গোত্র, পেশা নির্বিশেষে সবাই তার কাছে সমান গুরুত্ব পায়। তাইতো এই মানুষটির সিগনেচার লাইন হলো ‘#আসুন_মায়া_ছড়াই’ জানা যায় ছোটোবেলা থেকেই পাঠের অভ্যাস গড়ে উঠেছিলো মানুষটির। বাড়ির পরিবেশটিই ওমন ছিলো। তারপর ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে লেখার অভ্যেস। ভাগ্যিস লিখতে বসেছিলেন তিনি। নয়তো এত সুন্দর সুন্দর শব্দে মোড়ানো গল্প, উপন্যাস কিংবা নীতিবাক্যই বা কোথায় পেতাম? যা আমদেরকে বরাবরই করে আসছে অনুপ্রাণিত।

এখানে মোট গল্প আছে ৪৩ টি। সবগুলোই যে গল্প ঠিক তা না, কিছু অনুচ্ছেদে স্যার কিছু উপদেশ দিয়েছেন জীবন নিয়ে। বাকি গল্পগুলোর মাঝে সবগুলোই মূলত বিভিন্ন মানুষের জীবনের টুকরো অংশ। কিছু মানুষের শূন্য থেকে শুরু করে, অনেক কাঠখড় পেরিয়ে আকাশের বিশালতায় পৌঁছানোর গল্প। কিছু গল্প একান্তই স্যারের জীবনে থেকে নেওয়া। এরা গল্পে হলেও তাই বাস্তব এবং সত্যি।

প্রতিটি গল্প শুরু করার আগে গল্পের প্লটের সাথে মিলিয়ে বাংলা ও ইংরেজি কিছু কবিতা ও গানের অংশবিশেষ দেওয়া আছে। এই গান কবিতার টুকরো লাইনগুলো একটা আভাস দেয়, পরবর্তীতে কী পড়তে যাচ্ছি সে সম্পর্কে।

এবার আসা যাক বইয়ের মূল লেখায়। পুরো বই পড়ে শেষ করার পর বইটির মূল ব্যাপারগুলো আমি কয়েকটি কথায় বলতে যাচ্ছি। স্যার বইয়ের মাধ্যমে আমাদের সবাইকে কিছু ব্যাপারে শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। যে ব্যাপারগুলো আমি বুঝেছি সেগুলো হলো:

  • জীবন ছোটো। জন্মের পর থেকে আমাদের একটাই গন্তব্য, মৃত্যুর দিকে। এই ব্যাপারটা গভীরভাবে অনুধাবন করা উচিত।
  • একজন ভালো শিক্ষকের অবস্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে। কোনো অবস্থাতেই তার অসম্মান করা যাবে না।

মাদক এমন এক নেশা যা আমাদের পশুর থেকেও হীন করে তুলে। এই ব্যাপারটা স্যার একটা চমৎকার গল্প দিয়ে বুঝিয়েছেন। যেখানে এক দল শিশু “ইউ কিল্ড মাই মা, ইউ কিল্ড মাই পা, বাট আই উইল ভোট ফর ইউ” বলে স্লোগান দেয়। কী ভয়ানক! শিশুরা তো পবিত্রতার প্রতীক তাহলে তাদের মুখে কেন এমন ভয়ঙ্কর কথা?

  • ইতিবাচক জেদ তোমাকে বিজয়ের সর্বোচ্চ আসীনে তুলবে। কারণ এই জেদ নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার জেদ।
  • মানুষ তার ক্ষমতা সম্পর্কে উদাসীন। যদি সে নিজের দিকে তাকাতো তাহলে দেখতে পেত কী বিশাল ক্ষমতা সে উপেক্ষা করে গেছে।
  • আমরা যাদের সাথে মিশি, আমাদের অগোচরে আমাদের ভবিষ্যতটা তারাই নির্ধারণ করে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সবারই সতর্ক হওয়া উচিত।
  • কিছু দিয়ে যদি কাউকে বশীভূত করা যায় তবে তা হচ্ছে বিনয়।
  • কোনো টিম ওয়ার্কে প্রত্যেক সেক্টরের মানুষ সঠিক ভাবে কাজ করলেই লক্ষ্য অর্জন করা যায়। সেক্ষেত্রে এই অর্জনের ভাগ ও সবাই পাওয়ার দাবিদার তা সে বড়ো কর্তাই হোক বা সামান্য ঝাড়ুদার।
  • কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য সঠিক সময় বলে কিছু নেই। সবাই তো চিরদিন জীবনে থাকে না। তাই আমাদের জীবনে যারা তাদের ভালোবাসা আর সাহচর্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তাদের জানিয়ে দেওয়া উচিত আমরা কৃতজ্ঞ এই অমূল্য ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে।

হেলিকপ্টারটি ভেঙে যাচ্ছিলো। কিন্তু লোকটি একটুও ভয় পাননি। কেন জানেন? কারণ তিনি জানেন, মাটির দুনিয়ায় তার মা তার জন্যে দোয়া করছেন। মায়েদের দোয়ার এমনই তো শক্তি। সন্তানকে বাঁচিয়ে দেয় কত হাজার হাজার দুর্দশা থেকে। এই মমতাময়ীকে ভুলে যাওয়া কি পাপ নয়?

  • আমরা অন্যদের সাথে যা করি, প্রকৃতি আমাদের দিনশেষে তাই ফিরিয়ে দেয়। নিজের আচরণের প্রতি সতর্ক থাকা উচিত।
  • আমরা যতো বড়োই হই পা মাটিতেই থাকা উচিত।
  • কারো মন খারাপের কারণ না হয়ে কারো মন খুশির কারণ হতে পারতাম যদি আমরা?

১৪৩ পৃষ্ঠার এই বইয়ে আছে নানা ধরণের সত্য ঘটনা, আর জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা। সবগুলো ঘটনার মাঝে একটা আমার মনে বেশ দাগ কেটেছে। ৮ নর্থ ডাকোটে স্টেট ইউনিভার্সিটে কথা বলতে গিয়ে এক যুবক কিছু অসামান্য কথা বলে। পৃথিবী বিশ্বকে বদলে দিতে পারে যে পদক্ষেপ তা হলো, কাইন্ডনেস। অন্যের প্রতি দয়াশীল হওয়া, ভালোবাসা দেখানো। এই দিয়েই হয়তো শোধ করা যাবে এই পৃথিবীর যাবতীয় ঋণ। ওই আকাশকেও ছুঁয়ে দেয়া যাবে আলতো করে।

আত্ম-উন্নয়ন মূলক এই বইটি প্রত্যেকেরই পড়া উচিত। ছোটো এই বইটি পরতে বড়োজোর ঘন্টা তিনেক সময় লাগতে পারে। এই তিন ঘন্টা একটা জার্নি। ভালোকে জানার, খারাপকে জানার, আমাদের কেমন হওয়া উচিত, কিভাবে আমরা নিজেদেরকে মানসিকভাবে আরেকটু উন্নত করতে পারি, জেদ কোথায় দেখানো উচিত, কোনো বিষয়গুলো পরিহার করা উচিত এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আমরা জানতে পারবো। যেহেতু নানা ঘটনার আলোকে এইসব কথা বলা  হয়েছে তাই পরতে একঘেয়েমি লাগবে না।

বইয়ের নাম: স্বপ্নডানা
লেখক: বাদল সৈয়দ
ধরণ: আত্ম উন্নয়ন ও মোটিভেশন
প্রকাশন: বাতিঘর
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা
প্রথম প্রকাশ: ২০১৯
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪৩
মুদ্রিত মূল্য: ১৩৪

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here