এক রাতে ঘুম আসছিলো না বলেই একটা গল্প লিখা হলো। সেই গল্পের নামও রাখা হলো ‘একটি নির্ঘুম রাতের গল্প’। ফেসবুকে দেয়ার পর বেশ সাড়া পেল গল্পটি, পাঠকরা এই গল্প এতই পছন্দ করলো যে তারা এই ছোটো গল্পের বিস্তারিত রূপ চেয়ে বসলো। গল্পের লেখিকা পাঠকদের ডাকে সাড়া দিলেন, নিজের নানা অভিজ্ঞতার আলোকে সেই ছোটো গল্পকে পরিণত করলেন উপন্যাসে। আর এভাবেই সৃষ্টি হলো প্রেমাতাল।
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় লেখিকা মৌরি মরিয়ম এর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘প্রেমাতাল’। বইটি ২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বাংলার প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। আজকে কথা বলবো বইটি নিয়ে।
প্রেমাতাল মানে প্রেমে মাতাল। নাম শুনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এটি একটি প্রেমের উপন্যাস। বইয়ে যাওয়ার আগে একটু লেখিকা সম্পর্কে জানা যাক। লেখিকা মৌরি মরিয়ম পড়াশোনা করেছেন সাংবাদিকতা নিয়ে। বই পড়ায় হাতেখড়ি ছোটোবেলা থেকে। মায়ের কাছ থেকে এই নেশা পেয়েছেন তাই প্রথম বই উৎসর্গ করেছেন মা’কে। তারপর ধীরে ধীরে লেখালেখির দিকে মনোযোগ যায় তার। বর্তমানে লেখালেখিই তার ধ্যানজ্ঞান, সবকিছু।
এবার তবে আসা যাক বইয়ে। ‘প্রেমাতাল’ আপাদমস্তক একটি প্রেমের উপন্যাস, প্রেমকে উপজীব্য করেই এর সমস্ত ঘটনা আবর্তিত হয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘তিতির ও মুগ্ধ’। বইয়ের শুরুতেই আমরা দেখতে পাবো তিতিরের ফোনে কল করেছে মুগ্ধ। তাদের কথোপকথনে বাজছে বিচ্ছেদের সুর। একটু দূর এগিয়ে গেলেই আমরা দেখতে পারবো স্মৃতিচারণ। যেখান থেকে আমরা জানতে পারবো তিতির ও মুগ্ধের প্রথম পরিচয়ের কথা।
একটি ট্রাভেল গ্রুপের সাথে ট্যুর দিতে গিয়ে পরিচয় হয় তাদের। তারপর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা যার প্রেক্ষিতে কাছাকাছি আসতে থাকে দু’জনে। ট্যুর শেষ হতেই হারিয়ে ফেলে দু’জন দু’জনকে, তারপর আবার খুঁজে পায়। এবার শুরু হয় তুমুল প্রেম। প্রেমিক প্রেমিকার নানা খুনসুটির মধ্যে দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিলো উপন্যাস। তাদের পৃথিবী জুড়ে শুধুই তারা দুইজন আর তাদের ভালোবাসা।
প্রেম মাত্রই সেখানে বিচ্ছেদের সুর বাজবে। সুখেদের সাদা মেঘেদের তাড়িয়ে সেখানে জায়গা করে নেবে যন্ত্রণা, দুঃখ কষ্টে ভরা রূপোলি মেঘ। এখানেও তাই এর ব্যতিক্রম হয়নি। ঘটনাক্রমে তাদের এইসব খুনসুটির জায়গা দখল করে নেয় বিচ্ছেদ। তাদের মধ্যে ক্রমাগত বাড়তে থাকে দূরত্ব। এত প্রেম ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও বিচ্ছেদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে এই যন্ত্রণার অবসানের।
বইয়ের একটা ব্যাপার বেশ ভালো লেগেছে। যে কারণেই তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয় এবং তারা বিচ্ছেদের পথে হাঁটে। তাদের মাঝে ভালোবাসার পাগলামি আমরা বইয়ের শুরুতে এবং দূরত্ব তৈরি হওয়ার পরেও দেখতে পাবো। এতকিছুর পরেও কিন্তু তারা তাদের আত্মসম্মানবোধকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সাথে পরিবারকেও প্রাধান্য দিতে ভুলেনি।
বইয়ের ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো একে আপনারা চাইলে অ্যাডভেঞ্চারাস বইও বলতে পারেন। কারণ, লেখিকা কেন্দ্রীয় চরিত্রদের বান্দরবানের পাহাড়ে, রাস্তায়, থানচির টিলায়, ঝর্ণায়, সাঙ্গু নদী, সিলেটের গোয়াইনঘাট, চট্রগ্রামসহ নানা জায়গায় ঘুরিয়েছেন। আর তাদের মাধ্যমে সেইসব জায়গার অনিন্দ্য সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। তুলে ধরেছেন সেখানকার খাবার, যাতায়াত ব্যবস্থার নানা দিক আর এইসব জায়গার অপার সৌন্দর্য। জায়গাগুলোর বর্ণনা বেশ আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখিকা, যা পাঠকের মনে এইসব জায়গা দেখতে চাওয়ার একটা আগ্রহ তৈরি করে। বই পড়তে পড়তে আমিও কল্পনায় ঘুরে এসেছি এসব জায়গা এবং আশা রাখি বাস্তবেও সুযোগ করে যাবো।
প্রেমাতাল একটি প্রেমের উপাখ্যান। দুটি মানুষ, তাদের মধ্যেকার প্রেম, ভালোবাসা, রোমান্স, খুনসুটি, দূরত্ব, সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে না পারার ব্যর্থতা, সব বাঁধা পেরিয়ে একসাথে থাকতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এইসব নিয়েই প্রেমাতাল।
প্রেমাতাল তিতির ও মুগ্ধের গল্প। বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে হাঁটতে কি তাদের রাস্তা আলাদা হয়ে গিয়েছিল? নাকি বিচ্ছেদের হাত ধরেই এসেছিলো নতুন শুরু? এসব জানতে হলে পড়তে হবে বইটি।
ব্যক্তিগতভাবে আমি বই পড়ি দুটো কারণে। এক, আমি বই থেকে নতুন কিছু শিখবো, জানবো। দুই, আমি নিছক আনন্দ লাভ করবো। প্রেমাতাল পড়ে আমার মনে হয়েছে এ থেকে তেমন শেখার কিছু নেই। যেহেতু আমি অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করি আর লেখিকার বিভিন্ন জায়গার উপস্থাপন বেশ প্রশংসনীয় ছিলো তাই আমার খুব একটা খারাপ লাগেনি।
আপনি যদি প্রেমের গল্প বা অ্যাডভেঞ্চারাস বই পছন্দ করেন তাহলে প্রেমাতাল আপনার লিস্টে রাখতে পারেন। তবে, অত্যন্ত দুঃখের সাথেই বলতে হচ্ছে যে বইটি বর্তমানে স্টক আউট!
বইয়ের নাম: প্রেমাতাল
লেখক: মৌরি মরিয়ম
ধরণ: উপন্যাস
প্রকাশন: বাংলার প্রকাশন
প্রচ্ছদ: আবুল ফাতাহ
প্রথম প্রকাশ: ২০১৮
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩৬০
মুদ্রিত মূল্য: ৫৮০