রাতের আকাশ বলেই এক-দুইটা করে তারা দেখা যাচ্ছে। বেশ দূরত্ব তাদের মাঝে। ঝগড়া করেছে হয়তো। কিন্তু চাঁদটা যে কোথায় লুকালো, কে জানে। চারদিকে তাই ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে যাকগে, সেই বিশাল আকাশের নিচে মাটির বিছানার উপর একটা চাঁটাই বিছানো। তাতে গোল হয়ে বসে আছে কিছু গ্রামের ছেলে-মেয়ে। তাদের মাঝখানে একটা কেরোসিনের কুপিবাতি নিভু নিভু হয়ে জ্বলছে। এই বাতি অন্ধকারকে তাড়ানোর বদলে আরো ঘন করে তুলেছে। পাশের পুকুরটার বাঁশঝাড় থেকে কিছু জোনাক পোকা সবুজ আলো জ্বালিয়ে-নিভিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে আশেপাশে। একটা হালকা ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে। থেকে থেকে শোনা যাচ্ছে নিশির ডাক। এমন পরিবেশেই ছেলে-মেয়েদের মাঝে একটু বড়ো যে ছেলেটা সে শুরু করে দেয় দৈত্য দানোর কেচ্ছা, কখনো ডালিমকুমার, পরীদের রাজ্যের কথা বলে, কখনো বলে ওই এক চোখওয়ালা বিশাল দৈত্যের কথা। সবথেকে ছোটো মেয়েটা দৈত্যের কথা শুনে ভয় পায়, ভয়ে ঝাপটে ধরে বড়ো কারো হাত কিংবা কাপড়ের একপাশ, কিন্তু তাও সে কেচ্ছা শোনা বন্ধ করে না। কেচ্ছাকাহিনি শোনার এমনি নেশা তার।
কিসসা মানে গল্প, লোককাহিনি কিংবা উপকথা। কিসসার কথা মনে হলেই তাই উপরের ছবি ভাসে আমার চোখে। কিঙ্কর আহসানের লেখা কিসসাপূরণ বইটি হাতে নিতেই তাই মন কেমন করে। উল্টাতে থাকি পাতা। গ্রোগ্রাসে গেলা হয় গল্পদের। একটা সময় ফুরিয়ে আসে পাতা। বন্ধ হয় বই। চোখের কোলে ভাসে কাচা ধানের সবুজ রং, শৈশবের সব রঙিন দিন, কৈশোরের প্রেম, জন্ম, মৃত্যু, গভীর দুঃখবোধ, হতাশা আরো নানাকিছু। এই তো গল্পের আসল সৌন্দর্য। সে তার নিজস্ব ছাপ রেখে যাবে পাঠকের হৃদয়ে।
কিসসাপূরণের লেখক কিঙ্কর আহসান। যিনি বেদনার বেনোজলে ভাসতে ভাসতে দুঃখ, কষ্ট, জরা, বেদনার গল্প খুঁজতে চেয়েছিলেন। যা খুঁজে পেয়েছেন তাই দিয়েই কি রচনা করলেন কিসসাপূরণ? ব্যক্তি কিঙ্কর আহসান সম্পর্কে তেমন কিছু লেখা নেই ফ্ল্যাপে। না থাকুক, আমরা চলে যাই লেখায়, যেখানে আমরা খুঁজে পাবো লেখক কিঙ্কর আহসানকে।
বইয়ে মোট গল্প আছে চল্লিশটি। বেশিরভাগ গল্পেই আছে দুঃখবোধ। আছে, শৈশবে ফিরে যাওয়ার হাহাকার, কৈশোরের অবুঝ প্রেম, ভালোবাসার কাছে নিজেকে হারিয়ে দেওয়া। আছে জন্ম-মৃত্যুর সহাবস্থান, প্রিয়জন হারানোর দুঃখ। ক্ষুধার কাছে পরাজিত মানুষের কথা আছে, আছে প্রতারণা, লোভ আবার বিবেকের দংশনে সেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এইসব নিয়েই তো জীবন। লেখক তো তাই চেয়েছিলেন। আমাদের দুঃখের গল্প শোনাতে চেয়েছেন, চেয়েছেন জীবনের গল্প শোনাতে। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে লেখক স্বার্থক।
শুরুতেই যে গল্প তার নাম ‘কাদের আইসক্রীম’। কাদের আইসক্রিম বেচে সংসার চালায়। আইসক্রীমের বক্স হাতে নিয়ে সে বলতে থাকে’
“রঙিন আইসক্রিম, নারিকেল আর ডিম – সোয়াদে মাথা ঝিমঝিম/ কাদেরের আইসক্রিম, মুখে দাও আর গলে যাও।”
বাচ্চারা ছুটে আসে, আইসক্রিম কেনে আর কাদের পায় তার বেঁচে থাকার রসদ। হঠাৎ করেই বাজারে আসে মেশিনের টিউব আর স্লাইস আইসক্রিম। কাদেরের ব্যবসা লাটে উঠে। কেউ আর এখন কাদেরের আইসক্রিম চায় না। কাদেরের রাগ হয় হিংসা হয়, সেটা ভীষণ আকার ধারণ করে যখন তার ছোটো মেয়েটাও টিউব আইসক্রিম খেতে চায়। কাদের বরফের মতোই ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দেয়। ক্ষুধা, রাগ, হিংসা নিরীহ কাদেরকে করে তোলে নিষ্ঠুর। এমনি তো হয় জীবনে। হয় না?
আমরা ততক্ষণ পর্যন্তই অন্যায় সহ্য করে যাই যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই অন্যায় আমাদের সাথে হচ্ছে। লেখকের ‘তপোভঙ্গ’ গল্পটি যেন এই ব্যাপারটিই আমাদের সামনে আবার তুলে ধরলো। গোপাল এতদিন পর যা করতে চললো, চাইলেই কি সে আরো আগেই কাজটি করতে পারতো না? কিসের অপেক্ষা করছিলো তাহলে সে?
“খাওয়াই তো ভগবান। আমিষের উপাসনাই ধর্ম।”
না এটা আমার কথা না। এটা ধানীর উপলব্ধি। ক্ষুধার কাছে সকল অনুভূতিই যেন নস্যি। পেটে ঠিকঠাক খাবার থাকলেই অন্য অনুভূতিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। উপাসনার ধানী এই কথাই বুঝি বুঝিয়ে গেল আমাদের।
জীবনে মৃত্যুর চেয়ে সত্য আর কী আছে? আমরা জানি, তাও কারো মৃত্যুতে আমরা অবাক হই! জন্ম মাত্রই তার মৃত্যু আছে। জন্ম আর মৃত্যুর এই সহাবস্থানই জীবন। বইয়ের বেশ কয়েকটি গল্পেই তাই মৃত্যু আছে। লেখকের লেখা এত সাবলীল এবং মর্মস্পর্শী যে আমাদের দৃশ্যপটে ভেসে উঠে চা-পাতা বিছানো কফিনের লাশ, কোরআনের ধ্বনি আসে ভেসে, আগরবাতির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে কল্পনায়!
পরের জন্য ফাঁদ পাতলে সে ফাঁদে আটকা পড়তে হয় নিজেকেই। প্রবঞ্চন, গুল্লি, বাঘবিধবা যেন এই প্রবাদ বাক্যেরই বিস্তারিত রূপ। তবে প্রত্যেকটা গল্পেরই প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং সুখপাঠ্য।
ভালোবাসার মতো অদ্ভুত কিছু হয়তো এই পৃথিবীতে নেই। কখন, কাকে যে ভালো লেগে যায় আর সেই ভালোবাসা যে মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। জেসমিনকে এক ঝলকের দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলো তোজাম্মেল। সেই ভালোবাসার জের ধরে সে যেখানে ভেসে যাচ্ছিলো তার থেকে ফেরার পথ কই তার? কিংবা মোহর গল্পের নিতিনের কথা ধরা যাক। কখনো ভালোবাসেনি রাসমণিকে। যখন ভালোবাসে বুঝতে পারলো তখন সব শেষ, কান্নাই যেন তার ভালোবাসার শেষ প্রকাশ!
শেষ, যে গল্পটা নিয়ে কথা বলতে চাই তার নাম ‘পুরুষরা এবং নারী’। পুরুষ এবং নারীদের মাঝে পুরুষ সুরক্ষিত অবস্থায় থাকলেও ‘পুরুষরা এবং নারী’ এর মাঝে নারী বেশ অরক্ষিত অবস্থাতেই থাকে। রোজকার চলাফেরার মানুষটা কখন যে হায়েনা হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় তা কেই-বা বলতে পারে!
চল্লিশটি গল্পের মাঝে থিম হিসেবে কাঠের শরীর, পাতকী, মোহর, লালমাইয়ের লাল মাটি, অসুখের গান, কড়ি খেলবার ঘর, রক্ত কষ্ট শোক, বাঘ বিধবা বেশ অন্যরকম এবং বেশি ভালো লেগেছে আমার। একটু যেন নতুনত্বের ছোঁয়া।
জীবনের সব থেকে সুন্দর সময় হয়তো শৈশব। আকাশের বুকে জমা মেঘেরা তখন কখনো বাঘ, কখনো ভাল্লুক হয়ে সামনে আসে, সবুঝ প্রান্তরের সাথে গড়ে উঠে সখ্যতা, ফড়িঙের পেছনে ছুটেই কাটিয়ে দেওয়া যায় একটা আস্ত দিন। বাবাদের ভয়ে সন্ধ্যে হলেই পড়তে বসার তাগিদ, পড়াতে মন কই? মন পড়ে রয় সেই বন-বাঁদাড়ে, সেই বুনো ফুলের কাছে। এর মাঝেই ঝুপ করে নেমে আসে কৈশোর। একটু বড়ো হওয়ায় একটু বেশি স্বাধীনতা। হুটহাট একটা কাউকে মনে ধরে যায়। বৃষ্টির দিনের মতো দিন শেষ হওয়ার আগেই যেমন সন্ধ্যা নামে, তেমনি একদিন কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই যেন চলে আসে যৌবন।
বড়ো হলেই সবকিছু জটিল হয়ে যায়। ইচ্ছে হলেই ছুটে যাওয়া যায় না কোথাও। দায়িত্ব, সমাজের চাপ আমাদের করে দেয় ভীষণরকম হিসেবী। কিন্তু আমাদের ঈশ্বরও জানেন ঐ বেহিসেবী জীবনে যাওয়ার জন্য কী তীব্র হাহাকার বাজতে থাকে হৃদয় জুড়ে। এই হাহাকার নিয়েই ছুটে চলা, এইতো জীবন। আর এই জীবনের গল্প নিয়েই কিসসাপূরণ।
বইয়ের নাম: কিসসাপূরণ
লেখক: কিঙ্কর আহসান
ধরণ: গল্প
প্রকাশন: বাংলার প্রকাশন
প্রচ্ছদ: মেহেদি হাসান
প্রথম প্রকাশ: ২০১৭
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৭৬
মুদ্রিত মূল্য: ৩৫০