Home নির্বাচিত রিভিউ পালামৌ: ভ্রমণ সাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন

পালামৌ: ভ্রমণ সাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন

পালামৌ: ভ্রমণ সাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন
প্রচ্ছদটি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত সংস্করণের।

বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণ বিষয়ক দশটি বাছা বাছা বই যদি নির্বাচন করতে বলা হয় তাহলে সবার প্রথমেই নাম আসবে পালামৌ এর। আমাদের সাহিত্যে ভ্রমণ বিষয়ক উপাখ্যানের সফল গ্রন্থ সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পালামৌ।

সঞ্জীবচন্দ্র তাঁর কর্ম জীবন শুরু করেছিলেন কেরানি হিসেবে। ইংরেজদের সেই যুগে তিনি একটি গ্রন্থ লিখেন যার নাম ‘Bengal Ryots: Their Rights and Liabilities’ সাহেবদের বেশ নজর কাড়ে বইটি এবং এই বইয়ের জন্যেই তাকে কেরানি থেকে সরাসরি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে পদন্নোতি দেওয়া হয়।

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের কাজের সূত্র ধরেই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পালামৌ গিয়েছিলেন। অবস্থান করেছিলেন বছর দুয়েকের মতো, তখন তিনি যুবক। তার অনেক পরে যখন বার্ধক্য তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে তখন তিনি লিখতে বসেছিলেন পালামৌ।

পালামৌ গ্রন্থটি ছয়টি প্রবন্ধ হিসেবে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার ছয়টি সংখ্যায়। পরবর্তীতে এই ছয়টি প্রবন্ধ একত্র করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয় কিন্তু, ততদিনে লেখক পাড়ি জমিয়েছেন অজানায়।

এবার আসা যাক পালামৌতে। ভ্রমণ কাহিনিতে আমরা যেমন দেখি; দিনলিপির মতো ভাগ করে লেখক সব ঘটনা তুলে ধরেন এখানে কিন্তু তা হয়নি। লেখক এখানে স্মৃতিচারণ করেছেন, প্রকৃতির সাথে তার সখ্যতাকে তুলে ধরেছেন। সাধারণ ঘটনাকে অসাধারণ করে উপস্থাপন করেছেন তার লেখনশৈলীর গুণে।

পালামৌ বিহারের দক্ষিণে অবস্থিত। তিনি ভেবেছিলেন শহরের মতোই হবে। গিয়ে দেখেন এ এক গভীর অরণ্য। যতদূর চোখ যায় কেবল পাহাড়। আমরা বাঙালিরা আজীবনই সমতল ভূমিতে বসবাস করে আসছি। পাহাড় দেখলেই আমাদের শিশুদের মতো আনন্দ হয় এবং লেখকও যে তার বাইরে নয় তার উল্লেখও তিনি করেছেন। তারই বরাত দিয়ে তিনি বলেছেন,

পালামৌ পরগণায় পাহাড় অসংখ্য, পাহাড়ের পর পাহাড়, তাহার পর পাহাড়, আবার পাহাড়; যেন বিচলিত নদীর সংখ্যাতীত তরঙ্গ।

ছোট্ট একটি উপমা, কিন্তু একই সাথে আমাদের দৃশ্যপটে এঁকে দিল পাহাড় আর নদীর ছবি।

বইয়ের একটি অংশ হুবুহু তুলে দিচ্ছি যেখানে লেখক বলেছেন,

নিত্য অপরাহ্নে আমি লাতেহার পাহাড়ের ক্রোড়ে গিয়া বসিতাম, তাবুতে শত কার্য থাকিলেও আমি তাহা ফেলিয়া যাইতাম। চারিটা বাজিলে আমি অস্থির হইতাম; কেন তাহা কখনো ভাবিতাম না; পাহাড়ে কিছুই নূতন নাই, কাহারো সহিত সাক্ষাৎ হইবে না, কোনো গল্পই হইবে না, তথাপি কেন আমাকে সেখানে যাইতে হইতো জানি না।

প্রকৃতির সাথে এই তো আমাদের সংযোগ। তার নির্জনতা আমাদের প্রবলভাবে টানে। এইসব পাহাড়, নদী, সুবিশাল আকাশ, ঘন সবুজ অরণ্য, গোধূলির সময়কার অপার্থিব নিস্তব্ধতার যে গূঢ় রহস্য তা আমরা ভেদ করতে পারি না কিন্তু তাদের উপেক্ষা করার মতো সামর্থ্য আমাদের কই?

প্রকৃতির এই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখার জন্যেই বুঝি সে আমাদের ডাকে। তার নির্জনতায় আমাদের একটু জিরিয়ে নিতে বলে যেন আবার পুরো উদ্যমে শুরু করা যায় সব।

শুধু কি প্রকৃতি? সেখানে বসবাসরত আদিবাসীদের কথাও তুলে ধরেছেন। জানিয়েছেন তাদের জীবন-যাপন সম্পর্কে। কিভাবে কোল’রা এই পাহাড়ের গায়ে টিকে আছে, তাদের আচার-উৎসব, বিয়ে, রীতি-নীতি নিয়ে লিখেছেন। কিভাবে ঋণের নামে সারাজীবন মহাজনেরা তাদেরকে গোলাম করে রাখেন তাদের সেই দুর্দশার কথাও জানিয়েছেন।

এই আদিবাসীদের কথা বলতে গিয়েই লেখক লিখেছেন, বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে । না, আদিবাসীদের ছোটো করে তিনি এ কথা বলেননি, বরং কদর্যে ভরা পৃথিবীতে এই সহজ সরল মানুষগুলোকে বেমানান লাগে বলেই এই কথা। সৌন্দর্যে ভরপুর পালামৌর পাহাড়ের ভেতর এই সহজ সরল মানুষগুলোর সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করে তাই এটাই তাদের আদর্শ স্থান।

ভ্রমণকাহিনি হলেও লেখক পালামৌ ভ্রমণের অনেক পরে এটি সম্পর্কে লিখেছেন। বর্ণনা করেছেন গল্পোচ্ছলে তাই অনেক কিছুই বলার খাতিরে বলে গেছেন যার উপস্থিতির তেমন প্রয়োজন ছিলো না। লেখকের ইংরেজ বিদ্বেষের কিছু ছাপও বইতে পাওয়া যায়।

সাধু ভাষায় লেখা হলেও লেখকের এত সুন্দর উপস্থাপন আর উপমার জন্য এই বই সুখপাঠ্য। স্বয়ং রবি ঠাকুরও বইটির পর্যালোচনা লিখেছেন যা বইটির গুরুত্বের ভারকে আরো ভারী করে তুলে।

ভ্রমণপিপাসুরা অবশ্যই পড়ে দেখবেন বইটি। লেখকের সাথে একটু পালামৌ ভ্রমণ কিন্তু আপনাদের খারাপ লাগবে না। বাংলাদেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রথম বই হিসেবে এটি তাদের প্রকাশনী থেকে বের করে। পরবর্তীতে আরো প্রকাশনী থেকে বইটি মুদ্রিত হয়।

বইয়ের নাম: পালামৌ
লেখক: সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ধরণ: ভ্রমণ সাহিত্য
প্রকাশন: মাটিগন্ধা
প্রচ্ছদ:
প্রথম প্রকাশ: ২০১৫
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৭০
মুদ্রিত মূল্য: ১০০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here