প্রায় আট হাজার মিলিয়ন মানুষের এই পৃথিবীতে প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা। প্রতিটি মানুষের কাছে জীবন একেক রকমভাবে ধরা দেয়। সফলতার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম হলেও প্রত্যেক মানুষই জীবনে সফলতা চায়। ঠিক সেভাবেই জীবন যেভাবেই ধরা দিক না কেন, মানুষ মাত্রই তা একদম শেষ পর্যন্ত তা বয়ে নিয়ে যায়।
বেলাশেষে গল্পের প্রধান যে চরিত্র তার নাম নেই। আমরা নিজেদের পছন্দমাফিক তার একটি নাম দিতে পারি। কিংবা ধরে নিতে পারি স্বয়ং লেখকই মূল হোতা। সে যাকগে, এবার আসা যাক মূল আলোচনায়।
বেলাশেষে বইটি মূলত আমাদের কর্ম জীবনের নানা দিক নিয়ে লেখা। একটি চাকরি পাওয়ার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে, তাতে জয়েন করা, কাজ করা, পদোন্নতি এবং নানা ক্ষেত্রে যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা নিয়েই বইটি। একই সাথে এই কর্ম জীবন কীভাবে আমাদের ব্যক্তি জীবনকেও প্রভাবিত করে সেদিকেও লেখক আলোকপাত করেছেন।
ছোটোবেলায় যখন আমরা স্কুল, কলেজে পড়ি আমাদের চোখে তখন অদৃশ্য রঙিন চশমা থাকে। আমাদের স্বপ্ন, চিন্তা-ভাবনা সব কিছুই রঙিন থাকে তখন। বিদ্যালয়, কলেজের পাঠ চুকিয়ে যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ঢুকি, চশমা তখনো ঝুলতে থাকে চোখে। প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষ এর পর তৃতীয় বর্ষে সে চশমা নড়বড়ে অবস্থায় দুলতে থাকে চোখের সামনে। শিক্ষা জীবন শেষ হওয়ার পর রঙিন চশমা খুলে পড়ে গেলে, সাদা-কালো চোখে আমরা প্রথমবারের মতো বাস্তবিক দুনিয়া দেখি।
ছোটবেলা আমাদের প্রত্যেকেরই ভবিষ্যত পেশা নিয়ে স্বপ্ন থাকে। বড়ো হতে হতে অনেকে সেই স্বপ্ন হারিয়ে বাস্তবকে মেনে নিয়ে জীবন চালায়। আবার অনেকে সেই একই স্বপ্নকে আগলে রাখে এবং স্বপ্নকে পূরণ করতে সক্ষম ও হয়। অনেকেই আবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে অতল আঁধারে।
লেখক এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন,
‘জীবনে বড়ো হতে হলে শুধু নিজের ইচ্ছাটুকুই যথেষ্ট, কথাটা পূর্ণ সঠিক নয়, জোরালো পারিবারিক সাপোর্টও থাকতে হয়।’
সত্যিই তো, পরিবারের সহায়তা ছাড়া জীবনে এগিয়ে যেতে পারে কয়জন? অনেকেই হয়তো পারে। তবে সার্বিক বিচারে তা কী খুব নগণ্য নয়? তাছাড়া ব্যতিক্রম তো ঠিক উদাহরণ হয়ে ওঠে না।
গল্পের যিনি নায়ক তিনি আমাদের বর্তমান সময়ের চিরপরিচিত এক চরিত্র। ভদ্রলোক বেকার। চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় প্রাইভেট একটি ফার্মে চাকরি হয়েও যায় তার। দিনশেষে দুটি খাওয়া পরার ব্যবস্থা তো হলো। ভেবেছিলেন আস্তে আস্তে পদোন্নতি হলে অনেক কিছু করবেন। অফিস পলিটিক্সের নোংরামো হয়তো জানা ছিলো না তার, তাইতো নিজের আশাই তীব্র হয়ে বুকে বিঁধেছিল শেষবেলায়।
গল্পের আবেশেই একে একে আবর্তিত হয় নন্দীনি, শান্তা, সম্পা চরিত্ররা। এদের মধ্যে দিয়েই লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে কর্মজীবনের সীমাবদ্ধতা অফিসের ডেস্ক ডিঙ্গিয়ে একে একে গ্রাস করছিলো ব্যক্তি জীবনকেও।
জীবনে যে পেশাকে অবলম্বন করেই আমরা এগিয়ে যাই না কেন, তাতে গ্লানি থাকুক কিংবা প্রশান্তি, জীবন কিন্তু থেকে থাকার নয়। জীবন এগিয়ে যেতে থাকে তার নিয়মে। মাঝখানে শুধু মিলে না আমাদের যাবতীয় হিসাব।
পেশাগত জীবনের যত সুখ, দুখ, ব্যর্থতা, যত অভিযোগ সব নিয়েই বেলাশেষে। স্যুট টাই পরে এসি রুমে বসে কাজ করতে থাকা মানুষটার মনেও যে গ্লানি আসতে পারে তারই আখ্যান উপাখ্যান এই বেলাশেষে।
বেলাশেষে শুধু একটাই প্রত্যাশা যোগ, বিয়োগ, ভাগ, গুণে সবার হিসেব মিলুক। প্রশান্ত নামুক হৃদয় থেকে হৃদয়ে।
বইয়ের নাম: বেলাশেষে
লেখক: অপু হাসান
ধরণ: উপন্যাসিকা
প্রকাশন: বাংলার প্রকাশন
প্রচ্ছদ: সানজিদা স্বর্ণা
প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৮
মুদ্রিত মূল্য: ১৫০