একুশ আমাদের চেতনার সাথে জড়িত। সেই চেতনাকে শ্রদ্ধাবোধ জানিয়ে ২১ জন লেখকের ২১টি গল্প নিয়ে ২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বই ‘একুশের একুশ গল্প’।
নিচে পাঠ পর্যালোচনাসহ কিছু গল্পের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:
★অপেক্ষার পত্র -রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে সোচ্চার প্রতীশ। এদিকে তারই অপেক্ষাপানে প্রহর গুণতেছে অশাবরী৷ শেষ পর্যন্ত প্রতীশ ও অশাবরীর কী হয় জানতে পড়তে হবে অপেক্ষার পত্র।
পাঠ পর্যালোচনা: এই লেখিকার মাঝে রবীন্দ্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ একটা গল্পটাকে না কী চমৎকারভাবে বর্ণনা করলেন! গল্পে অশারবীর মনের আকুতি কী নিখুঁতভাবে না বর্ণনা করলেন! লেখিকা এখানে শুধু ৫২ না ৭১ও এনেছেন। লেখিকা এখানে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
★অবশেষে মিলন-নিহাতের বিবাহিত স্ত্রী ইরিনা। কিন্তু দু’জনে একই বাসায় থাকলেও আলাদা রুমে থাকে। ইদানিং ইরিনা আশিক নামের একটা ছেলের সাথে ফোনে কথা বলে। তাদের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বন্ধুত্ব থেকে হয় প্রেম। একসময় তারা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রেলস্টেশনে আশিকের আসার কথা থাকলেও সে আসেনি৷
রহস্যটুকু জানতে পড়তে হবে সাজি অাফরোজের ‘অবশেষে মিলন’।
পাঠ পর্যালোচনা: এই গল্পে দারুণ একটা মেসেজ রয়েছে। গল্পে রয়েছে ভালোবাসার মর্যাদা দিতে শেখার কথা, লোভ ত্যাগ করার কথা।
★সমুদ্র দর্শন- কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পা রাখল রিফাত। এর আগে একবার এসেছিল। সেবার সঙ্গী ছিল স্ত্রী ও একমাত্র সন্তান। কিন্তু সেবার ঘটেছিল হৃদয়বিদারক এক ঘটনা!
কক্সবাজারের পাশাপাশি সিডনি শহরের অপরূপ প্রকৃতির বর্ণনা রয়েছে৷
পাঠ পর্যালোচনা: এই গল্পে কাহিনির পাশাপাশি প্রকৃতির অপরূপ বর্ণনা রয়েছে। গল্পে পড়তে পড়তে আপনি চলে যাবেন কক্সবাজারের মনোরম প্রকৃতিতে, চলে যাবেন সিডনির অপেরা হাউজের সেই মনোরোম বিল্ডিংয়ে। কল্পনা করবেন সত্যিই পৃথিবীতে কতই না সুন্দর জায়গা রয়েছে।
শেষটা চমৎকার বর্ণনা দিয়ে লেখক গল্প শেষ করেছেন।
★দায়িত্বের শিকল- ইতির সাথে রাসেলের বিয়ে হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার মা। কারণ তার মাঝে যে সংসারের দায়িত্ব বোঝা। কিন্তু সেই ইতির মা একসময় ইতিকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়!
পাঠ পর্যালোচনা: এই গল্পটা সংসারে যারা কলুর বলদ তাদের জন্য। যারা সংসারের জন্য নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়, নিজের স্বার্থের দিকে ভেবে দেখে না তার শেষ পর্যন্ত জীবনে কী-বা পায়!
★মহাকালের প্রতিশোধ- সামাদ হক ও সায়রার একমাত্র সন্তান আরিফ । কিন্তু বিদেশ গিয়ে সে ভুলে গেছে বললেই চলে। আরিফের স্ত্রীও শ্বাশুড়ির সাথে তর্ক করে।
দুজনের কথোকপথের মাঝে সামাদ হক তাদের সেই অতীতের কথা স্মরণ করে দেয় সায়রার মনে।
পাঠ পর্যালোচনা: এটা একটা শিক্ষামূলক গল্প, বোধোদয়ের গল্প। এই ধরনের গল্প বেশি বেশি বেশি লেখা উচিৎ। তবেই
পৃথিবী থেকে বৃদ্ধাশ্রম শব্দটা এক সময় দূর হবে বলে আমি মনে করি। মা বাবারা পাবে সন্তানের কাছে নিরাপদ আশ্রয়।
★চিরস্থায়ী সুখের স্বপ্ন-এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জুনাইদ। যে নামাজের জন্য সবাইকে ডাকে। একবার সে বাসে করে পিরোজপুর যাচ্ছিল৷ কিন্তু পথিমধ্যে বাসের সমস্যা দেখা দেয়ায় বাস গেল থামে। এদিকে জুমআর নামাজের সময় হয়ে গেছে। জুনাইদের মুখে চিন্তার ছাপ। শেষ পর্যন্ত জুনাইদ কি জুমআর নামায পড়তে পেরেছিল? জানতে পড়তে হবে সাইফুল ইসলাম সজীবের চিরস্থায়ী সুখের স্বপ্ন।
পাঠ পর্যালোচনা: এটা একটা শিক্ষামূলক। আল্লাহর জন্য, নামাযের জন্য একজন নামাযপ্রিয় বান্দার কেমন মন কাঁদে গল্পটা না পড়ে বোঝাই যাবে না! অসাধারণ শুরু ও চমৎকার শেষ দিয়ে গল্পটা শেষ হয়েছে।
★বিবেক- পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও ফেসবুকে একটাই সংবাদ ঘুরে ফিরে দেখা যাচ্ছে। তা হলো, ‘ জনপ্রিয় সিনে অভিনেতা রাহুল খান তার নিজ মায়ের হাতে খুন হয়েছেন!’
এই লোমহর্ষক খুন সারাদেশে তুমুল ঝড় তুলেছে। আলোচনার শীর্ষে এই সংবাদ, কেন রাহুল খানকে খুন হতে হলো? তাও আবার নিজ মায়ের হাতে!
রহস্যের গভীরে যেতে পড়তে হবে শাহেদুল ইসলাম মাহিমের বিবেক।
পাঠ পর্যালোচনা: এই গল্পের শেষে পাঠক চমৎকার একটা মেসেজ পাবে। সত্যিই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার চেয়ে আমাদের সুশিক্ষায় মানুষ হওয়া উচিত। যেটা গল্পে রাহেলা বেগমের মনে অনুধাবন হয়েছিল।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: প্রথমে বলব, বইয়ের প্রচ্ছদ বেশ সুন্দর। বইটা উৎসর্গ করা হয়েছে ভাষ শহীদদের। প্রকাশক, সম্পাদকের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধুবাদ জানাই।
সহজ সরল বর্ণনায় গল্পগুলো বেশ ভালো লেগেছে। কিছু কিছু লেখায় মনে হচ্ছে আমি যেন রবীন্দ্রনাথের গল্প পড়ছি।
এবার আসছি খারাপ লাগা দিক নিয়ে। বইয়ের কিছু গল্প আমার কাছে প্রবন্ধের মতো মনে হয়েছে। বইয়ের বেশ কিছু জায়গায় ভুল বানা৷ পরিলক্ষিত হয়েছে।
কর্মব্যস্ত এই জীবনে যারা এক বসাতে বইটি পড়তে চান তারা অবলীলায় বইটা পড়তে পারেন৷
বইয়ের কিছু প্রিয় উক্তি:
★ ‘ভালোবাসার মর্যাদা দিতে শেখো, লোভ ত্যাগ করো। তাহলে জীবনে সুখী হবে।’
★’সত্যিকারের ভালোবাসায় প্রতিশোধ নয়, কাছে টেনে নিতে হয়।’
★’তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে জান্নাতের স্বপ্ন দেখেন, আর আমি নামাজ না পড়ে স্বপ্ন দেখি। তার আর আমার মধ্যেে চাহিদা একটাই, কিন্তু সেই চাহিদার জন্য করা কর্ম কেন ভিন্ন হচ্ছে? তিনি এত কষ্ট করে জান্নাত পেতে চান, আর আমি কি ফ্রি ফ্রি পাবো?’
বইয়ের নাম: একুশের একুশ গল্প
লেখক: এম ইমন ইসলাম (সম্পাদক)
ধরণ: যৌথ গল্পগ্রন্থ
প্রকাশন: আলোর ঠিকানা প্রকাশনী
প্রথম প্রকাশ: ২০২১
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৯৬
মুদ্রিত মূল্য: ১২১