Home উপন্যাস শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরঃ সাঁতারু ও জলকন্যা।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরঃ সাঁতারু ও জলকন্যা।

0
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়েরঃ সাঁতারু ও জলকন্যা।

মন খারাপ, কোনো কিছুতেই কনসেন্ট্রেশন দিতে পারছিলাম না। বই পড়তে নিলেই নেট খুলে ডিস্ট্রাক্ট হয়ে যাচ্ছিলাম। মন চাইছিল খুব সুন্দর না হোক, এক নাগাড়ে কিছুতে ডুবে থাকার মত কিছু পেতাম, অদ্ভুত অশান্তি থেকে কিছু সময় এর জন্য বাঁচা যেত।কয়েকটা বই পড়ার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু মন দিয়ে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল না।

তাই ছোট কিছু খুঁজছিলাম যাতে একটানে পড়া চালিয়ে যেতে পারি, খুঁজতে খুঁজতে পেলাম। পড়া শুরু করেছিলাম নিতান্তই মন খারাপ করে, গল্পের শুরুতে এল অলক। চুপচাপ, শান্ত-স্বভাবের গাছের মত এক ছেলে, কোনো কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না, মিথ্যা দোষারোপ এ দু চার ঘা মার খাওয়া, অপমানেও যে রা কাড়ে না। অদ্ভুত শান্ত, দৃঢ়, তাকে ঠিক বোঝা যায় না, সে কম কথা বলে এবং তার অনেক কাজই স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না, আশেপাশের লোকে খানিকটা ভয় ও পায় তাকে।

তার সমস্ত আগ্রহ শুধু জলে। সাঁতারু সে। জাতীয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার বিস্তর অর্জন। তবে এসবে অলকের হেলদোল নেই। কাপ- মেডেল, খ্যাতি, এটেনশন না, সে শুধু জলে থাকতে চায়। জলের মধ্যেই তার জগৎ, জলই তার দ্বিতীয় জননী। জল তার পরম নির্জন-আকাঙিক্ষত একাকিত্ব, আত্মার প্রতিবিম্ব। পরিবারের অন্য সকলের চেয়ে আলাদা হওয়ায় অন্যরা তাকে ঠিক বুঝতে পারে না।

এরপর এল বনানী, মন খারাপে যেন এক চিলতে প্রশান্তি নিয়ে এল মেয়েটা, বর্ধমানের গরীব ঘরের মেয়ে বনানী। রোগেভোগা, শরীর মাথায় ঘা আর রোগ নিয়ে জর্জরিত বনানী এই বইয়ের সবচেয়ে পছন্দের চরিত্র আমার। অভাবের সংসারে যাকে চাওয়ার কেউ নেই। মরার জন্যই যেন জন্ম বনানীর। বেঁচে থাকতে পারে তারাই যাদের বেঁচে থাকাটা অন্য কেউ চায়। যাদের ভালোবাসার লোক আছে। বনানীর তো সেরকম কেউ নেই। এত সমস্যা ও টানাপোড়েনে কে চাইবে যে সে বেঁচে থাকুক?

অভাবের সংসার আর মাসির অত্যাচার এ তার ঠাঁই হয়েছিল দাশশর্মাদের ভিটেতে।সে বাড়ির ও নানান টানাপোড়েন, ভাঙনের ঢেউ তাকে নিয়ে আসে উত্তর কলকাতার সোনালি পিসির বাড়িতে।

সোনালি পিসি, আইবুড়ো, মুখে হম্ভিতম্ভি করা ভালো মনের মানুষ। কাজের লোক হয়ে এলেও সন্তানহীন সোনালি পিসি বনানীকে দেখেন সন্তানস্নেহে। বাড়ির হর্তাকর্তা সোনালিপিসির বাস বুড়ো বাবা মা কে নিয়ে, পার্থিব সম্পত্তির ঝুটঝামেলাতে ভাইদের সাথে তেমন বনে না।তবে অলকের সাথে এই বাড়ির সম্পর্ক সেসবে টান খায় না। খুব সুন্দর স্বচ্ছ সম্পর্ক অলকের, ঠাম্মি- দাদু আর পিসির সাথে। সম্পর্কের পোড় খাওয়া মানুষগুলো অলককে পেয়ে তাই দিব্য আনন্দে সময় কাটায়।

ব্যস্ত অলকের সময় কাটে বিভিন্ন সাঁতারের প্রতিযোগিতা, প্রেস-সাংবাদিক, পার্টি, নারীসঙ্গ আর জলে ভেসে। জলে ভাসতে ভাসতে প্রায়ই যে জলকন্যার দেখা পায় অলক, কে সে? কি সম্পর্ক ওই জলকন্যার অলকের সাথে। সে কি অলৌকিক? যার ডাকে, মাঝরাতে তীব্র শীতের বরফ পানিতে ভূতগ্রস্তের মত অক্লান্ত সাঁতরে ছুটে চলে অলক!

দাদু সৌরীন্দ্রমোহনের পায়ের কাছে বসে বেলা দশটার রোদে খবরের কাগজ পড়ে শুনানো বনানীর রুটিন। এইরকমই এক সকালে রাস্তা থেকে একটা গমগমে গলার ডাক, এতদিনকার সে রোগেভোগা,ঘা পাঁচড়ায় জর্জরিত, উপরকার মাথার ছাদ আর দুবেলা ভাতের চিন্তা করা বনানীর জীবনকে এক লহমায় পাল্টে দিল।সেই থেকে জাদুর কাঠির স্পর্শেই যেন বদলে যেতে লাগল বনানী।একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল তার সাথে।সকলের সাথে বনানী নিজেও বিস্মিত তার আকস্মিক পরিবর্তনে।

গল্পের প্লট এগোতে থাকে মনীষা,সত্যকাম,ঝুমুর নূপুর,সুছন্দাদের নিয়ে।পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক চাপে পিষ্ঠ অলক একদিন সিদ্ধান্ত নেয় সব ছেড়েছুড়ে দীর্ঘ সাঁতারে যাবে,যা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাঁতার, মাইলের পর মাইল ছুটবে সে,হারাতে হলে সে জলেই হারাবে।হারিয়ে যাওয়া অলক কি পারবে সাঁতরে তার জলকন্যাকে খুঁজে নিতে?

যাদের আপাতত বড় উপন্যাস কিংবা তথ্যসমৃদ্ধ গুরুগম্ভীর কিছু পড়তে মন চাইছে না,তারা রিফ্রেশিং এর জন্য পড়তে পারেন। ঘণ্টা দেড়েকেই পড়া হয়ে যাবে।

ভালো লাগার একটা উক্তি: “শুধু বেঁচে থাকতে পারলে কোনোরকমে কেবলমাত্র বেঁচে থাকতে পারলেও জীবনে কত কী যে হয়!”

বইয়ের নাম: সাঁতারু ও জলকন্যা
লেখক: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ধরণ: পশ্চিমবঙ্গের উপন্যাস
প্রকাশন: আনন্দ পাবলিশার্স
প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৬
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৭৯
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here