প্রারম্ভিকা
‘সে কি রাত্রির শেষ মৃত পাখি, যার স্মৃতি আঁচড়াল
মৃত্যুর ঘন ছায়ায় দেবযান
ভয়ের মতন মৃদুসঞ্চারী স্বপ্নের পিছু নিতে?
স্বপ্নের মত আয়ু চলে যায়, কখনো বা দ্রুত, কখনো বিলম্বিতে। ‘
—পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল
বন্ধু হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে আপন কোন কেন্দ্র যা আমরা মনের পুরো পরিধি নিয়ে এঁকে থাকি । পত্র পত্রিকা থেকে পুরো সমাজ এই বিশ্বাস করে ফেলেছে যে, কবি অমিতাভ মিত্রকে খুন করেছে তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু লেখক অরুণ চৌধুরী । খুনের সময়ে অমিতাভ মিত্র উঠতি জনপ্রিয় কবি ছিলেন যার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এক সাংবাদিক বলেন, ‘ কৃত্তিবাসের কবিকুলের পরের প্রজন্মের যে কয়েকজন শক্তিশালী কবি বাংলা সাহিত্যে এসেছেন, দেবারতি মিত্র, মৃদুল দাশগুপ্ত অথবা রনজিৎ দাশ—অমিতাভ মিত্রের নাম তাদের পাশে থাকবার মতো শক্তিশালী । ‘
কবিতাপ্রেমী এবং রহস্য উপন্যাস প্রেমীদের কাছে এই বইটি হয়ে উঠবে দুর্দান্ত, অসংখ্য কবির অনেক হৃদয়গ্রাহী কবিতাই আছে এই বইতে, সেই সাথে আছে একটা রহস্য !
সাংবাদিক তনয়া ভট্টাচার্য সেই তদন্তে নেমেছেন, ৪৫ বছর আগে খুন হওয়া কবির হত্যা রহস্যের কী সমাধান মিলবে এই বইয়ে?
এই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে আমার এই লেখাটি আপনাদের পড়তে হবে ধৈর্য্যের সাথে শেষ পর্যন্ত ।
চরিত্র পরিচিতি
(১) অমিতাভ মিত্র
(২) অরুণ চৌধুরী
(৩) তনয়া ভট্টাচার্য
(৪) ড্যানিয়েল লামা
(৫) সঞ্জয় অধিকারী
(৬) প্রশান্ত গুরুং
(৭) অনন্যা চৌধুরী
(৮) বাবলা
(৯) সিদ্ধার্থ
(১০) আনিসুর
এবং অপ্রধান চরিত্রে আরও অনেকে ।
কাহিনী সংক্ষেপ
এই উপন্যাসের শুরুতে আমরা দুজন বন্ধুর কথা জানতে পাই, যাদের আত্মিক টান ছিলো প্রখর,দুজনই একে অন্যের খুবই ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরেও উঠতি জনপ্রিয় কবি অমিভাভ মিত্র তারই প্রাণপ্রিয় বন্ধু অরুণ চৌধুরীর হাতে খুন হন, এই খুনের ঘটনাটা কোন স্পয়লার নয় বরং বইয়ের ফ্ল্যাপেই লেখক তা পাঠককে জানিয়ে দিয়েছেন । লেখক অরুণ চৌধুরীই খুনটা করেছেন এটা সবাই প্রকাশিত সত্যের মতো জানলেও পুলিশ অরুণ চৌধুরীকে আটক করে রাখতে পারেনি । যখন খুন হয়েছিল অমিতাভ মিত্রের তখন অরুণ চৌধুরী পুলিশ স্টেশনেই বসেছিলেন,এই স্ট্রং অ্যালিবাই এর কারণে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু সেই অরুণ চৌধুরীর পিঠের খুনি ট্যাগলাইন কী কখনো মুছেছিলো?
না,মুছেনি কখনোই, ৪৫ বছর আগের সেই খুন বাংলা সাহিত্য জগৎকে নাড়া দিয়ে এসেছে এই এতোটা বছর ধরে । এই ঘটনা রহস্যের চাদরেই মোড়ানো ছিলো এতো বছর , সেই চাদর সরাতেই তনয়া ভট্টাচার্য নামে একজন বত্রিশ বছর বয়সী সর্বভারতীয় এক সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিক এগিয়ে এলেন । দেশে ঘটে যাওয়া অমীমাংসিত রহস্যকাহিনী সমাধান করে, ম্যাগাজিনে তার আদ্যোপান্ত তুলে ধরে তার প্রতিভা ও বিচক্ষণতার যে পরিচয় তিনি দিয়েছেন,এজন্য পুরস্কারও জিতেছেন । এই অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান নিয়ে তার ম্যাগাজিনের শেষ কেইসটা দাখিল করতে চাইলে, সেই অরুণ চৌধুরীই মেয়েটিকে অমিতাভ মিত্রের খুনের তদন্ত করতে নিষেধ করে দেন !
তনয়া ভট্টাচার্যের মনে তখন একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খায়, অরুণ চৌধুরী খুনি না হলে তদন্ত করতে তিনি নিষেধ করবেন কেন?
সেই কী বিকৃতমনা খুনি বন্ধু?
আর খুনের সময় অরুণ চৌধুরী থানায় কেন বসে ছিলেন নির্দোষ সাজার জন্য?
প্রথমত, তার বন্ধু অমিতাভ প্রতিভাবান কবি ছিলেন, তার যখন জনপ্রিয়তা ছিলো, সেই সময়ে অরুণ চৌধুরী রীতিমতো ফ্লপ লেখক ছিলেন । এজন্য অমিতাভকে ঈর্ষা করতেন অরুণ চৌধুরী,অমিতাভের খুনের পরেই অরুণ চৌধুরীর বই প্রথম বাজারে হিট করলো ।
দ্বিতীয়ত, সঞ্জয় অধিকারীর কাগজে অমিতাভ বিষ্ফোরক মন্তব্য করে লিখেছিলেন, ‘ অরুণের মতো বাজারি সাহিত্যিকেরা টাকা খাইয়ে পুজো সংখ্যাতে লেখার বরাত পায় । ‘
এতে অরুণের যে মানহানি হয়েছিলো তা কী দার্জিলিং এর এই বৃষ্টি এখনও মুছিয়ে দিতে পেরেছিলো?
বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক এই যে অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা এটা কী খুনের কারণ হতে পারে না?
জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশায় পথের কাঁটা বন্ধুকে রাস্তা থেকেই সরিয়ে এখন অরুণ চৌধুরী বেস্টসেলার লেখক, যার এক একটা বই গড়ে ত্রিশ হাজার কপি বিক্রি হয় এখন! এসব প্রশ্নে জর্জরিত তনয়ার ঘোর ভাঙতে বেশিদিন লাগেনি, লেখক নিজেই তাকে ফোন করে দার্জিলিং যেতে বলেন । তনয়া এক বাক্যে রাজি হয়ে দার্জিলিং চলে আসেন । সে জানে আজীবন এই খুনি ট্যাগ লাইন বয়ে নিয়ে বেড়ানো অরুণ এবং তার পরিবারের পক্ষে সত্যিই বোঝা হয়ে গিয়েছিলো । অরুণ চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎকারে এসে, তনয়া সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেলো এজন্য যে, লেখক তনয়াকে বলেন,সেই তার বন্ধুকে খুন করেছে কিন্তু খুনের রহস্য নিয়ে কিছুই বলবে না বরং সে তনয়াকে একটি উপন্যাস ধরিয়ে দিয়ে বলে, এই মার্ডার মিস্ট্রি উপন্যাসের শেষটা নেই, এটার সমাধান খুঁজে ফেলতে পারলে আপনি খুনিকে ধরে ফেলতে পারবেন অনায়াসে ।
এই মার্ডার মিস্ট্রি বইটির লেখকের নাম শুনে তনয়া চমকে ওঠে!
কে ছিলো সেই বইটির লেখক?
অরুণ চৌধুরী তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে কেনই বা হত্যা করবেন ?
লেখক তাকে বিভ্রান্ত করার জন্যই কী এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছিলো?
কী এমন তথ্যই বা আছে বইতে যা দিয়ে সে ৪৫ বছর আগের খুনের রহস্য বের করে ফেলতে পারবে! এসব নিয়ে ঘোরে চলে যান তনয়া ভট্টাচার্য ।
এত পুরোনো একটা অমীমাংসিত কেস হাতে নিয়ে নির্ধারিত ডেড লাইনের ভিতরে কীভাবে তনয়া কেসটির রহস্যের সমাধান বের করবে? এই ৪৫ বছরে অনেক সাক্ষীই যারা ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলো তারা আজ বেঁচে নেই ।
এতো বিচ্ছিন্ন তথ্য, ঝাপসা সাক্ষ্য ও বিবর্ণ জটিল সমস্যার আঁধারে তনয়া কী পারবে গোপন সেই বিকৃত খুনিকে তার ম্যাগাজিনের পাতার শিরোনামে আনতে?
তনয়া ধীরে ধীরে রহস্যের টুকরো টুকরো ক্লু থেকে সেই তিমির বৃষ্টির রাতের একটা গল্প দাঁড় করাতে গিয়ে ধারণা করে , ষাট-সত্তর দশকের রাজনীতির একটা বড় ভূমিকা আছে এবং সেই সাথে কানেকশন আছে নকশালের । উগ্র বামপন্থী বলে চিহ্নিত নকশালের জন্ম হয়েছিল চীন-সোভিয়েত ভাঙনের সময়ে যারা মতাদর্শগতভাবে চীনের মাও সে তুং-এর নিখুঁত পদাঙ্ক অনুসরণকারী । নকশালকে থামাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যে মৃত্যুর
মিশন জারি করে সেই সময়ে কী কবি অমিতাভ মিত্র কবিতা লিখে কারও দ্রোহের তোপে পড়ে জীবন হারিয়েছেন?
একজন বন্ধু কী কখনো তার আরেকজন বন্ধুকে খুন করতে পারে?
৪৫ বছর আগের সেই ঘটনায় চকবাজার থানার পুলিশ ইনচার্জ যে দার্জিলিং এর একচ্ছত্র অধিপতি ড্যানিয়েল লামা সে কেন অমিতাভের খুন নিয়ে কোন মন্তব্য জানাতে অস্বীকার করেন?
সে কী কোনভাবে এই খুনের সাথে যুক্ত ছিলেন?
এমন নানা প্রশ্ন বাণে জর্জরিত তয়না কী সঠিক পথেই তদন্ত করছেন না কি পুরো পরিশ্রম বৃথা গিয়ে আবার নতুন করে খুনিতে খুঁজতে নামবে সে ?
কে অমিতাভ মিত্রের বিকৃতমনা খুনি?
অরুণ চৌধুরী ?
ড্যানিয়েল লামা ?
নকশাল আন্দোলনের কেউ?
বাণিজ্যিক পত্রিকার কেউ?
নাকি এই প্রাচীরের বাইরের কেউ?
নাকি কেউ-ই না?
জীবনানন্দ দাশের মতো বলতেই হয়,
‘সকল রৌদ্রের মতো ব্যপ্ত আশা যদি গোলকধাঁধায় ঘুরে আবার প্রথম স্থানে ফিরে আসে, শ্রীজ্ঞান কী তবে চেয়েছিল?’
সকল বিচ্ছিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আপনাকে ৪০৩ পৃষ্ঠার এই বইটি এক নিঃশ্বাসে ধৈর্য্য ধরে পড়ে ফেলতে হবে ।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
(ক) পজেটিভ দিক
প্রথম পয়েন্ট :
শুধুমাত্র লেখকের সাহিত্যিক ভাষার উপস্থাপন দেখে আমি রীতিমত তার ভক্ত হয়ে গিয়েছি । উপন্যাসের একটা দৃশ্যে, তনয়া যখন অরুণ চৌধুরীকে বলেন, ‘যেহেতু আপনি নিজে ধরা পড়েননি, তাই আপনার প্রতিটা বইয়ে নিজের অপরাধকে সেলিব্রেট করে চলেছেন । ‘ তখন তনয়া লেখকের চোখের দিকে তাকিয়ে অনুভব করলেন অরুণ চৌধুরীর চোখের ভেতর একটা ইস্পাতের তলোয়ার ঝিকিয়ে উঠলো ।
কী চমৎকার সাহিত্যিক ভাষার প্রয়োগ! সত্যি পুরো বই জুড়ে এই প্রয়োগগুলো আমাকে অভিভূত করেছে বারবার।
দ্বিতীয় পয়েন্ট:
জাপানিজ থ্রিলার যারা পড়েন তারা অবশ্যই জানেন হনকাকু জনরা নিয়ে,যে জনরা পাঠকের ব্রেনের সাথে খেলে সমান্তরালে,যে গল্প একটি ক্রিমিনাল তদন্তের প্রক্রিয়ার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এবং বিশুদ্ধ যৌক্তিক যুক্তি থেকে প্রাপ্ত বিনোদনকে মূল্য দেয় । উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনা এক এক দিকে ঘুরে আবার একটা বিন্দুতে এসে মিলেছে, তাই হনকাকু জনরায় এই বইটি লেখকের লেখার এই প্রচেষ্টাকে সফল করেছে ।
তৃতীয় পয়েন্ট :
বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্রিকার লেখক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের যে সাপে নেউলে সম্পর্ক তা এই প্রথম কোনো লেখকের উপন্যাসে আমি পড়েছি । সত্যিটা সবসময়ই আকাশের চাঁদের মতোই প্রকাশ্য, লিটল ম্যাগাজিনে যারা লিখেন তারা বাণিজ্যিক পত্রিকার লেখককে পছন্দ করেন না, এই যে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য,এই টানাপোড়েন লেখক তা চমৎকার ভাবে প্রতিটা দৃশ্যপটে লেখক এই বিষয়টি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন ।
চতুর্থ পয়েন্ট :
দার্জিলিং এর অপরুপ সৌন্দর্য লেখক তার এই উপন্যাসে নিজের মনের মাধুরীর সব রঙ দিয়ে এঁকেছেন । সেখানের বৃষ্টির শব্দের মূর্ছনা যেন কানে ধরেই থাকবে পাঠকের । কুয়াশা ঘেরা দার্জিলিং এর ঠান্ডা আবহের মাঝে রহস্য নিয়ে পদচারণা,প্রকৃত পাঠককে বই পড়ার মোহে ফেলে দিতে বাধ্য করে দেয় অবচেতন মনে বারবারই। প্রকৃতির দৃশ্যায়নে লেখক তার সকল সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা করে গেছেন, সেই দিক থেকে বলা যায় বইটি অপূর্ব।
পঞ্চম পয়েন্ট :
উপন্যাসের ভিতরেই প্যারালালে আরেকটি উপন্যাস চলেছে এই বইয়ে, সেটা ঐ উপন্যাসটাই যা অরুণ চৌধুরী দিয়েছিলেন তনয়া ভট্টাচার্যকে, ৪৫ বছরের এই রহস্যটা খুঁজে বের করতে। প্যারালালি দুইটা উপন্যাস লেখক একটি বইয়েই বেশ ভালোই ব্যালেন্স করতে পেরেছেন, এতে তিনি প্রশংসার দাবী রাখেন ।
(খ) নেগেটিভ দিক
প্রথম পয়েন্ট :
পৃষ্ঠার বিচারে উপন্যাসটা আরও টানটান করাই যেতো, তাই কখনো মনে হয়েছে এতো ডিটেইলস ও তথ্য অপ্রাসঙ্গিক আবার কখনো গল্পটা বেশ স্পিডে টেনে নিয়ে আসা হয়েছে । অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা না বাড়িয়ে, আরও টানটান দৃশ্যপট উপস্থাপন করতে পারলে লেখাটা আরও গ্রহণযোগ্যতা পেতো ।
দ্বিতীয় পয়েন্ট :
একজন কবিতাপ্রেমী হিসেবে বইয়ে কবিতাগুলো দেখে ভালো লেগেছে কিন্তু যারা কবিতা পছন্দ করেন না তাদের ভালো লাগবে কি না সেটা পাঠকের উপরেই ছেড়ে দিলাম কারণ বইয়ে অনেক কবিতা আছে । উপন্যাসে অমিতাভের চিঠিগুলো পড়ে অমিতাভের আচরণ ও ব্যক্তিত্বের একটা ছবি ফুটে উঠলেও,সেই চিঠিগুলো থেকে রহস্য সমাধানের ক্লু পেয়ে তনয়া ভট্টাচার্য ৪৫ বছরের এই কেইসটা সমাধান করে ফেলবে এমন ভেবে পাঠক বইটা পড়লে হতাশ হবে ।
তৃতীয় পয়েন্ট:
লেখকের মতে, হনকাকু জনরা এসেছে ১৯৮১ সালে , যা অরুণ চৌধুরীর বয়ানে লেখক লিখেছেন কিন্তু এর অনেক আগেই হনকাকু জনরা জাপানিজ লেখকদের কলমের শৈল্পিক ছোঁয়াতে এসেছিলো । ইন্টারনেটের তথ্য মতে,
Pioneered by Edogawa Rampo, Seishi Yokomizo and Keikichi Osaka, Japan’s honkaku mysteries were hugely popular in 1920’s and 1930’s before a new emphasis fell on psychological-focused crime novels. অর্থাৎ, এডোগাওয়া র্যাম্পো, সেশি ইয়োকোমিজো এবং কেইকিচি ওসাকা দ্বারা প্রবর্তিত, জাপানের হনকাকু রহস্যগুলি ১৯২০ এবং ১৯৩০ এর দশকে মনস্তাত্ত্বিক-কেন্দ্রিক অপরাধ উপন্যাসের উপর নতুন জোর দেওয়ার আগে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল ।
তাই হনকাকু জনরার আবির্ভাবের সাল নিয়ে লেখকের দেয়া তথ্যটি একেবারেই ভুল তথ্য ।
চতুর্থ পয়েন্ট:
মিস্ট্রি উপন্যাস টানটান না হলে পাঠক সবসময়ের জন্য বইয়ে আকৃষ্ট হয়ে থাকেনা,উপন্যাসে তনয়া এবং সিদ্ধার্থের চরিত্রায়নটি কখনো কখনো একঘেয়েমিতে ফেলেছে, সিদ্ধার্থ চরিত্রটির সাথে তনয়া চরিত্রের এ্যাটাচমেন্ট আরেকটু গভীর করা যেতো । এছাড়া আরও কিছু চরিত্রের মধ্যে সেই এ্যাটাচমেন্টটা সেভাবে ছিলো না ।
পঞ্চম পয়েন্ট :
৪৫ বছরের আগের রহস্য কেউ সমাধান করতে পারেনি। উপন্যাসে লেখক গোয়েন্দা না নিয়ে এসে একজন সাংবাদিককে এনে একটা বৈচিত্র্য আনলেও রহস্য সমাধানের কোনো সেই শক্তপোক্ত প্রমাণ নেই যা দিয়ে অরুণ চৌধুরীকে আইনের হাতে সোপর্দ করে দিতে পারবেন তনয়া ভট্টাচার্য । তাই অপরাধী যদি কখনো বলেই বসেন তনয়াকে, ‘আপনার এই সমস্ত কল্পকাহিনীর তথ্যের ভিত্তি কোথায়? প্রমাণ করতে পারবেন, আমার স্বীকারোক্তি ছাড়া?’
তখন তনয়া ভট্টাচার্যের অসহায় হয়ে কলম কামড়ানো ছাড়া আর কিছু কল্পনা করতে পারছি না ।
বইটি কেন আপনি পড়বেন?
প্রকৃতি ও রহস্য মানুষকে মায়া বিস্তার করে কাছে টানতে বাধ্য করে । সেই প্রকৃতি ও রহস্যের পরীক্ষায় এই বই চোখ বন্ধ করে এ+ পেয়ে যায় ।
এই বই পড়তে পড়তে একসময় লেখকের সাহিত্যিক ভাষার প্রয়োগের প্রেমে পড়তে বাধ্য হবেন আপনি এতটুকু বলতে পারি । এই বই পড়ে পাঠক কল্পনায় দার্জিলিং এর সেই বৃষ্টি ও কুয়াশার অরণ্যে ডুব দিয়ে বইয়ের রহস্য সমাধানের নেশায় উত্তেজনার আবহ,নতুন তথ্য ও টুইস্টের জন্য প্রহর গুণে যাবেন । বইটি পড়ার আগে থেকেই পাঠক জানে অমিতাভ মিত্রের খুনি তারই বন্ধু অরুণ চৌধুরী, এটাই পুরো সমাজের ভাষ্য, সত্যিই কী বন্ধু বন্ধুকে খুন করতে পারে?
এক পর্যায়ে এই উপন্যাস রহস্য ছাপিয়ে কখনো মনে হবে কোনো বন্ধুত্বের গল্প পড়ছি । যারা উপন্যাসের শেষে টুইস্ট পেতে পছন্দ করেন তাদের জন্য এটি মাস্ট রিড একটি বই ।
সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ও বাঁধাই:
প্রচ্ছদ বা বাঁধাই নিয়ে আমার কোনো দ্বিধাই নেই এই বইয়ে। প্রচ্ছদে নতুনত্ব আছে, আছে রহস্যের ছোট্ট ক্লু ও, বইয়ের বাঁধাইও ছিলো মানসম্মত । কিন্তু সম্পাদনায় কিছু ঘাটতি ছিলো, এজন্য কিছু বানানে ভুল চোখে ধরেছে ।
ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৪/৫
লেখক পরিচিতি:
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৮২ সালে । তিনি পেশায় রাশিবিজ্ঞানী । বিশ্বসাহিত্যের নিষ্ণাত পাঠক শাক্যজিৎ বিচিত্র বিষয়ে নিরীক্ষামূলক গল্প, উপন্যাস লিখছেন সাম্প্রতিক সময়ে। এটি তাঁর প্রকাশিত পঞ্চম বই ।
বই ফটোগ্রাফি: রুদ্র রহমান
বইয়ের নাম: শেষ মৃত পাখি
লেখক: শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
ধরণ: থ্রিলার উপন্যাস
প্রকাশন: সুপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: সৌজন্য চক্রবর্তী
প্রথম প্রকাশ: ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪০৩
মুদ্রিত মূল্য: ৫২০